“হালার চাল তবুও শেষ হইলো না”

এলাকার চেয়ারম্যান মোতালেব সাহেব ত্রানের চাল নিয়ে পড়েছেন বিরাট ফ্যাসাদে। তার গুদামঘরে চুরি করা আশি বস্তা ত্রাণের চাল রাখা। সরকার যে একশো বস্তা বরাদ্দ দিয়েছিল তা থেকে ২০ বস্তা বিলি করে বাকী আশি বস্তা নিজের গুদামঘরে রাখছেন।তার ইচ্ছা ছিল, করোনা গেলে সময় সুযোগ বুঝে চাল আড়তদারের কাছে বিক্রি করে দিবে। গেলবার সরকারি বরাদ্দের চাল যে আড়তদারের কাছে বিক্রি করেছিলেন এবার তার কাছে করবেন না বলেও ঠিক করেছিলেন। হালায় একখান আস্ত চোর, চোক্ষের সামনে ওজনে গড়মিল করে, মাপে কম দেয়। তিনি সবই বুঝতে পারছিলেন কিন্তু সরকারি চাল আর উপয়ান্তর না দেখে খানিক লসেই বিক্রি করে দিলেন।এটাও ভেবেছিলেন এর শোধ তিনি আরেকদিন নিবেন। পরেরবার ম্যাজিস্ট্রেট আসলে এই হালার দোকানে আগে ম্যাজিস্ট্রেট আনবো, তখন বুঝবা চোরের দশদিন আর বড় চোরের একদিন!

যাই হোক, সবকিছুই প্লান-পরিকল্পনা মতই চলতেছিল। আশি বস্তা চাল নিয়ে তিনি খোশমেজাজে আছিলেন কিন্তু এর মাঝে হঠাৎ বাঁধা হয়ে দাঁড়াইছে র‍্যাব-পুলিশ, এই শুয়োরের বাচ্চাগুলো কথা শুনতেছে না কোথাও, সব সম্মানী ব্যাক্তি চেয়ারম্যান-মেম্বারদের বাড়িতে কথাবার্তা নাই উপস্থিত হয়া কইতেছে, চালের বস্তা বাইর কর! কওয়া মানে কাজ অর্ধেক করা সারা। এরা কি জানে, কত কষ্টে কত ট্যাকা পয়সা পাবলিকরে খাওয়াইয়া চেয়ারম্যান-মেম্বার হওয়া লাগে! তার উপর আবার উপরের নেতারাও কথা শুনতেসে না। এমন করলে রাজনীতি চলে? এইটা তারা বোঝে!

এরই মাঝে মোতালেব চেয়ারম্যান ঠিক করেন চুরি করা ত্রানের চাল তিনি বাড়িতে লুকায়ে রাখবেন। প্রয়োজনবোধে তিনি সারা বছর এই চাল খাবেন। এত টাকার চাল তো আর পাবলিকরে এমনিতে দেওয়া যায় না, পাবলিকও তো কম নিমকহারাম না!

মোতালেব চেয়ারম্যানের ছোট কাঁচাপাকা বাড়ি চুরি করা ত্রানের চালে ভরে যায়। রাতের অন্ধকারে লোক খাটায়ে বাড়ির আসবাবপত্র বাইরে এনে তিনি ঘরে ঘরে চালের বস্তা সাজান। লোকজন যাতে বুঝতে না পারে তাই আসবাবপত্র বিক্রি করে দেবার কথা ভাবেন। অবশ্য তিনি তার বুদ্ধি খাঁটিয়ে চালের বস্তা আসবাবপত্র হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে চুরি করা চালের বস্তা একের পর এক সাজিয়ে তার ও ছেলে-মেয়ের রুমে খাট বানিয়ে শোবার ব্যাবস্থা করেন। চালের বস্তা দিয়ে বানান টেবিল-চেয়ার। চালের বস্তা বিশেষ ভাবে সাজিয়ে আয়না লাগিয়ে মেয়ের জন্য তৈরি করেন ড্রেসিং টেবিল, আরও বানান সোফা, টি-টেবিল, বুকশেলফ। নিজের বুদ্ধিমত্তায় তিনি নিজেই শিহরিত। সমস্যা খালি বস্তার গন্ধে আর চালে লাগা নানান পোকামাকড়ে।

মোতালেব চেয়ারম্যানের জীবন কয়দিনেই অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। চালের বস্তা বাড়িতে এনে তিনি সাগর থেকে মহাসাগরে পড়েছেন। তিনি চিৎকার করে অথৈ মহাসাগরে ভাসছেন কিন্তু কেউ শুনতে পাচ্ছে না। তার বুকের ব্যাথাটা বাড়ছে।

মোতালেব চেয়ারম্যানের বাড়িতে খানা হয় চারজনের। আশি বস্তা চাল ছেলে-মেয়ে আর বউ নিয়ে কতদিনে শেষ হবে তার কোন হিসাব তিনি পান না। তার বউ-ছেলে-মেয়ে অলরেডি না জবাব দিয়ে দিয়েছে যে এই সস্তা চাল তারা খাবে না, এগুলো মানুষ খায়! কিন্তু চাল তো শেষ করতে হবে তাই তারা কষ্ট হলেও এই চাল আবার খায়। তবুও তো কিছুই হয়না চালের বস্তার । বুকের ব্যাথাটা আরও বাড়ে চেয়ারম্যানের।

মোতালেব চেয়ারম্যান এরপর বাড়িতে হুকুম জারি করেছে। আজ থেকে বাড়িতে নো মাছ-তরকারি অনলি ভাত খাইতে হবে সকলের, ত্যালফ্যাল ছাড়া লবণ মরিচে শুধু ভাত। এ বড়িতে থাকতে হলে প্রত্যেকের এক কেজি কইরে ভাত খাইতে হবে প্রতিবেলায়। বাড়ির সবাই তার হুকুম পালন করে। খাবার সময় হলে বউ-ছেলে-মেয়ে অশ্রুপাতে এক কেজি করে ভাত খায় প্রতিবেলায়, লবণ লাগে না দেখে চেয়ারম্যানের খুশি লাগে। এত খাবার পরেও চালের বস্তা কমে না। বুকের ব্যাথায় কুঁকড়ে ওঠেন মোতালেব সাহেব।

অন্যদিকে চালের বস্তায় ঘুমাতে ঘুমাতে চেয়ারম্যানের ছেলের গায়ে বস্তাপচা গন্ধ হয়ে যায়। তার অনেক কষ্টে পাওয়া প্রথম গার্লফ্রেন্ড প্রথমবার হাগ দিতে গিয়ে নাক সিঁটিয়ে ফিরে আসে। বেচারা মনে অনেক দুঃখ বাড়ি ফিরে আসে। তার মাথায় এখন অন্যচিন্তা তার বিলাইয়ের মত তুলতুলে আদরের গার্লফ্রেন্ডের জন্মদিনে কি দেওয়া যায় সেটা ভাবতে থাকে। এরমাঝে চেয়ারম্যান পরিবার বিকেলের-সন্ধ্যের নাস্তা হিসেবে চাল খাওয়া শুরু করে।মোতালেব চেয়ারম্যানের বউ চুরি করা ত্রানের চাল দিয়ে নানান রেসিপি বানাতে থাকেন। তিনি ইউটিউবে একটা চ্যানেলও খুলে ফেলেন, নাম দেন ‘ত্রান আপার রান্নাঘর ‘। ত্রানের চাল দিয়ে তিনি বানাতে থাকেন হরেকরকম রান্না, এই যেমন, ত্রানের চালের কেক, ত্রানের চালের কোপ্তা কারি, ত্রানের চালের স্যুপ (হরেকরকম ফ্লেভারের, ক্রিমি স্যুপের রেসিপি সবথেকে বেশি ভিউ পাইছে), ত্রানের চালের বারবিকিউ, ত্রানের চালের নুডলস, ত্রানের চালের সালাদ…. ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সকল রেসিপি আবার ফেসবুকে ত্রানচোর বউদের সিক্রেট গ্রুপে শেয়ারও দেন নিয়মিত। তার এখন অনেক ফ্যান।

অল্পদিন পরেই মোতালেব চেয়ারম্যানের বউয়ের পেট খারাপ হয়।পানি ছাড়া কিছু মুখে দিলেই টয়লেট চাপে। তাদের হাই কমোড আটকে গেছে চালে।বাংলা টয়লেট এখন ভরসা। চেয়ারম্যান বাড়ির কেউ এখন আর স্বাভাবিক মল ছাড়ে না। তারা হাগতে বসলে গু হিসেবে চাল বের হয়।হলুদ-লাল-খয়েরি রংয়ের চাল। হালার চাল তবুও শেষ হয় না।

মোতালেব চেয়ারম্যানের একমাত্র মেয়ের সাথে এখন কোন বান্ধবী মিশে না৷ তাঁকে সবাই ফেসবুকে আনফ্রেন্ড করছে। সিক্রেট গার্লস গ্রুপেও সে আর নাই। তেমন কিছুই সে করে নাই। তার স্কুলের কিছু বান্ধবী এই করোনা যাবার পরেই তাঁদের বাসায় বেড়াতে আসে একঘেঁয়েমি দূর করতে, তারা ট্রিট চায় তার কাছে, সে সবার জন্য এক থালা করে চাল আনে। এই দেখেই তার বান্ধবীরা অপমানে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। আজব তো! এতে অপমানের কি আছে? চাল কি মানুষ খায় না! দুই একটা না হয় পোকামাকড় ছিল, চামচ তো দিয়েছিলাম।

অপরদিকে মোতালেব চেয়ারম্যানের একমাত্র ছেলে প্রেমে ছ্যাঁকা খায়। ঘটনা তেমন কিছুই না। ছেলেটা তার তুলতুলে নরম আদরের প্রথম প্রেমিকার জন্মদিনে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলো। আদরের প্রেমিকাকে দুইহাতে চোখ বন্ধ করে নিয়ে যায় গিফটের কাছে। গিফট পেপারে মোড়ানো বিশাল গিফট দেখে আদরের প্রেমিকা খুশিতে আত্মহারা হয়ে ওঠে। আনন্দে গিফট পেপার খোলার পরে আবিষ্কার করে, আসলে তাঁকে দেওয়া হয়েছে এক বস্তা পোকা খাওয়া নষ্ট ত্রানের চাল। আদরের গার্লফ্রেন্ড একটুও দেরি করেনি, গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে থাপ্পড় দিয়ে বলে, কুত্তার বাচ্চা তোর সাথে ব্রেকাপ, আমারে আর ফোন দিবি না। সবকিছু শুনে মোতালেব চেয়ারম্যান বুকের ব্যাথায় হাত-পা ছোড়াছুড়ি করে। এতকিছুর পরেও হালার চাল শেষ হয় না!

মোতালেব চেয়ারম্যানের একমাত্র ছেলে সিদ্ধান্ত নেয় সে আত্মহত্যা করবে।যে জীবনে সে বিড়ালের মত তুলতুলে আদুরে গার্লফ্রেন্ড হারাইছে সে জীবন রেখে কি লাভ! আত্মহত্যার আগে সে ঠিক করে এই বাড়ি ঘর সে পুড়িয়ে দিবে। সারা বাড়িঘরে সে কেরোসিন তেল দিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। দাউদাউ করে পুড়তে থাকে চেয়ারম্যান বাড়ি। ত্রানের চালসহ ধরা পড়ে যাবার ভয়ে চেয়ারম্যান সাহেব খবর দেয় না ফায়ার ব্রিগেডে।বুকের ব্যাথা আর তার থামে না।

মোতালেব চেয়ারম্যানের বাড়ির চারপাশে হাজার হাজার মানুষ। উৎসবমুখর পরিবেশ। একটা অতিপ্রাকৃত ঘটনা ঘটে গেছে চেয়ারম্যান বাড়িতে। আগুনে সমস্ত বাড়ি পুড়ে ছারখার হয়ে গেলেও চেয়ারম্যান বাড়িতে রাখা বস্তা বস্তা চাল একদম ঠিক আছে। সব কিছু ছাঁই হলেও ত্রানের চালের বস্তা একদম অবিকল আছে, আগুনের একটু স্পর্শ সেখানে লাগে নাই।
ত্রাণের চালের খোঁজ পেয়ে আগুনে পুড়ে যাওয়া চেয়ারম্যান বাড়িতে পুলিশ আসে। মোতালেব চেয়ারম্যানকে পুলিশ ধরে থানায় নিতে চায়৷ চেয়ারম্যান সাহেব বুকে হাত দিয়ে বাংলা সিনেমার আনোয়ার স্টাইলে হার্টঅ্যাটাক করেন। হার্ট অ্যাটাকের আগে চেয়ারম্যানকে বলতে শোনা যায়, এতকিছুর পরেও হালার চাল শেষ হলো না।

মোতালেব চেয়ারম্যান পুলিশ কাস্টডিতে হাসপাতালে ভর্তি। ডাক্তারেরা তার বাঁচার আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন। মোতালেব চেয়ারম্যান ঘোরের মধ্যে থাকেন। তার পুরো শরীর অসাড়। চারপাশ অদ্ভুত আলোতে উজ্জ্বল। সবকিছু সাদা রঙের হয়ে গেছে। তার চোখ বন্ধ হয়ে আসে।ফ্ল্যাশব্যাকে সারাজীবন দেখতে পাচ্ছেন তিনি৷ মোতালেব চেয়ারম্যান বুঝতে পারেন তিনি মারা যাচ্ছেন। পাশে এক অদ্ভুত স্বর অস্পষ্ট উচ্চারণে বলে যাচ্ছে তার পরিণামের কথা। আশি বস্তা চাল যাদের পাবার কথা তারা না খেয়ে মারা গেছেন খোদা তাদের অভিযোগ শুনেছেন। আশি বস্তা চালের প্রতিটি দানা আগুনের ফুলকি হয়ে তার শরীরে ছড়িয়ে দেওয়ার হুকুম দেওয়া হয়েছে। মোতালেব চেয়ারম্যান কেঁদে ওঠেন। মৃত্যুর আগে খোদার নাম নিতে যান কিন্তু তার মুখ দিয়ে বের হয়, ‘হালার চাল তবুও শেষ হইলো না ‘।

লেখক- নাজমুস সাদাত নিলয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here