‘স্বাধীনতার সিঁড়ি ও একজন বঙ্গবন্ধু’

বাংলা ও বাঙালির হাজার বছরের সমৃদ্ধশালী ইতিহাসে ‘স্বাধীনতা’ বাঙালির আজন্ম লালিত স্বপ্ন। ঔপনিবেশিক যুগ থেকে শুরু করে মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের নেপথ্যের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন সংগ্রাম বাঙালি জাতিসত্ত্বাকে বিশ্বের বুকে অপ্রতিরোধ্য জাতি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে।আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক লাল সবুজের পতাকা অর্জনের ইতিহাস হাজার বছরের শৃঙ্খল মোচনের এক অমর মহাকাব্য। এই মহাকাব্যের রচয়িতা হচ্ছেন আমাদের আত্মপরিচয়ের ঠিকানা,বাঙালির অহংকারের সাতকাহন, আমাদের আত্মমর্যাদার প্রতীক, বাঙালির চেতনার রাজ্যে মুকুটহীন রাজা,হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি নাম নয়,একটি ইতিহাস,একটি আদর্শ ও দর্শনের নাম এবং হৃদয় জাগানিয়া বলিষ্ঠ শপথে শোষন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হওয়ার ঐকান্তিক চেতনা ও প্রেরণা।

প্রায় দুইশত বছর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পর ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের নায্য অধিকার হরণ করা থেকে শুরু করে যেসব বর্বরতার পরিচয় দিয়েছিলো সেটা আমাদের কারো কাছে অজানা নয়।বঙ্গবন্ধু এমন একজন ব্যক্তিত্ব যিনি বাঙালি জাতিকে অনন্যসাধারণ ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে পাকিস্তানের এই পরাধীনতার নিগড় থেকে মুক্ত করেছিলেন।বাঙালি জাতির স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলার রাজনৈতিক আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র। বাঙালি জাতির চিন্তার জগতে,মেধার উৎকর্ষে আমরা বঙ্গবন্ধুর বিশাল ব্যক্তিত্বকে খুজে পায়। ১৯৫২ এর টগবগে তরুণ শেখ মুজিব ৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু ও ৭১ এ মহান স্বাধীনতার মহানায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।যার ডাকে স্বাধীনতাকামী বাঙালি জনগোষ্ঠীর জাতিয়তাবাদী চেতনার আলো বলিষ্ঠ ও শাণিত হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু তার নেতৃত্বের সম্মোহনী শক্তির এক জাদুকরী স্পর্শে ঘুমন্ত ও পদানত বাঙালি জাতিকে জাগিয়ে তুলে স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্দীপ্ত করেছিলেন। যার ফলশ্রুতিতে আমরা পেয়েছিলাম রক্তিম লাল সবুজের পতাকা খচিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশ গঠনে হাত দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দেশের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম থেকে শুরু করে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে দেশের সর্বস্তরের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশগঠনে অনুপ্রাণিত করেন।বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও সোনার বাংলাদেশের। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে অনেকটা গুছিয়ে ফেলেছিলেনও বটে।

কিন্তু দেশগঠনের এই অগ্রযাত্রা বেশিদিন টেকসই হতে দেয়নি চক্রান্তকারীরা।স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি দেশের তৎকালীন অগ্রযাত্রাকে স্থবির করে দেয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুকে হত্যার হীন পরিকল্পনায় মেতে ওঠে।১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট স্বপরিবারে হত্যা করা জাতির এই মহান নেতাকে। মহীয়সী নারী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ,শেখ জামাল, শেখ কামাল, শিশু শেখ রাসেল সহ পরিবাবের ১৮ জন সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।প্রকৃতপক্ষে এর মাধ্যমে হত্যা করা হয় বাঙালি জাতির স্বপ্নকে। বঙ্গবন্ধুকে দৈহিকভাবে হত্যা করা হলেও বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু নেই। তিনি চিরঞ্জীব। কেননা একটি জাতিরাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং স্থপতি তিনিই। যতদিন এ রাষ্ট্র থাকবে, ততদিন অমর তিনি। সমগ্র জাতিকে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রেরণায় প্রস্তুত করেছিলেন ঔপনিবেশিক শাসক-শোষক পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে। তাই চিরঞ্জীব তিনি এ জাতির চেতনায়।বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি আজ এক সুতোয় বাঁধা- একটি অপরটির পরিপূরক, পরস্পর একাত্মা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই বাংলাদেশের স্বাধীনতার অনন্য স্থপতি। দীর্ঘ সাধনায় বাঙালির মানসলোকে তিনি সঞ্চার করেছেন স্বাধীনতার বাসনা। উপনিবেশ-শৃঙ্খলিত একটি ঘুমন্ত জাতিকে তিনি জাগ্রত করেছেন, তাদের করে তুলেছেন স্বপ্নমুখী, রক্তমুখী, মুক্তিমুখী। এই যে একটি জাতির মানস প্রকল্পকে জাগিয়ে তোলা- এটাই বঙ্গবন্ধুর অক্ষয় অবদান।

জাতির পিতার অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্ত করার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তারই যোগ্য কন্যা মাদার অব হিউম্যানিটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বর্তমান বাংলাদেশ দারিদ্র্যের কঠিন শিলাস্তর পাড়ি দিয়ে উন্নয়নের মহাসড়কে ধাবমান। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে ইতিমধ্যে আমরা উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পৌছাতে সক্ষম হয়েছি।বর্তমানে আমরা বিশ্বের ৪১ তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। আমাদের মাথাপিছু আয়ে এখন ২০৬৪ ডলার। আমাদের বৈদেশিক রিজার্ভ এখন ৪৪.০৩ বিলিয়ন ডলার।

খাদ্যে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি।আমাদের খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিমাণ ৫৩ লাখ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন। জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্সে ১৫৩ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৫০ তম ও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অবস্থান ৭ম।

মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে সরকার দেশের সমস্ত জনগণকে বিদ্যুতের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত গ্রহন করেছে।বর্তমানে ৯৯% জনগণ বিদ্যুৎ এর সুবিধা ভোগ করছে। মুজিববর্ষে কেউ যেন গৃহহীন না থাকে সেজন্য সরকার ৯ লাখ গৃহহীন মানুষের তালিকা প্রস্তুত করেছে এবং ইতিমধ্যে ৬৬ হাজার মানুষের কাছে জমিসহ গৃহের মালিকানা হস্তান্তর করেছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, স্বপ্নের পদ্মা সেতু,মেট্রোরেল, ও পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর এর মতো মেগাপ্রজেক্টগুলো বাস্তবায়ন এবং বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ বাংলাদেশের জন্য অনন্য অর্জন। এসকল কর্মযজ্ঞ সম্পাদিত হয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও সাহসী নেতৃত্বের কারণে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেখিয়েছেন যে তার নির্ভীক নেতৃত্বই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার প্রতিচ্ছবি। আমরা বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ আশাবাদী মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার সাহসী নেতৃত্বে ২০৪১ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়তে পারবো।

বঙ্গবন্ধু আজীবন স্বপ্ন দেখেছেন ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, গনতান্ত্রিক মানবিক বাংলাদেশের। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে হলে,শোষণমুক্ত,অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রকৃত দেশপ্রেম নিয়ে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশের জন্য কাজ করতে হবে। সেটাই হবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে বঙ্গবন্ধুর প্রতি সম্মান জানানোর শ্রেষ্ঠ উপায়। বাংলাদেশের এই দুর্নিবার অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক এবং মুজিবাদর্শ ছড়িয়ে পড়ুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

লেখকঃ মোঃ রায়হান আহমেদ। কর্মসূচি ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপ সম্পাদক, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) ছাত্রলীগ।

এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। স্টুডেন্ট জার্নাল-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।

 

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here