‘স্পিচ থেরাপি কি এবং কাদের জন্য’

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্পিচ থেরাপি এখনও তেমনটা জনপ্রিয় নয় যেমনটা অন্যান্য দেশে। অনেকেই হয়তো স্পিচ থেরাপি সম্পর্কে শুনেছেন কিন্তু এর কাজ সম্পর্কে তেমনটা জানেন না বা ধারনা নেই। চলুন জেনে নেই স্পিচ থেরাপি কি এবং কাদের জন্য স্পিচ থেরাপি প্রযোজ্য।

আমাদের চারপাশে আমরা প্রতিনিয়ত এরকম অনেক মানুষ দেখি যারা ঠিকমতো কথা বলতে পারেননা অথবা ঠিকমতো শব্দ বা বাক্য গঠন করে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারেননা।তাদের জন্যই আসলে স্পিচ থেরাপি।

স্পিচ থেরাপি কি?

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ছোট থেকে শুরু করে যে কোনো বয়সী মানুষের ভাষাগত ও যোগাযোগ সম্পর্কিত সমস্যা শনাক্তকরণ, এর কারন নির্নয় এবং উপযুক্ত পরামর্শ ও থেরাপি প্রদানই হচ্ছে স্পিচ থেরাপি। স্পিচ থেরাপিস্ট অথবা স্পিচ এবং ল্যাঙ্গুয়েজ প্যাথোলজিস্টরাই স্পিচ থেরাপি দিয়ে থাকেন।

স্পিচ থেরাপি যে সকল সমস্যা নিয়ে কাজ করে:

এটি সাধারণত কিছু নির্দিষ্ট সমস্যা নিয়ে কাজ করে। যেমন: উচ্চারনে সমস্যা, ভাষা বুঝতে ও প্রকাশ করতে সমস্যা, সামাজিক যোগাযোগে সমস্যা, ফ্লুয়েন্সি প্রবলেম (তোতলামি), রেজোন্যান্স প্রবলেম (ঠোঁট ও তালু কাটা), স্বরযন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা সহ স্নায়ুবিক নানা সমস্যার জন্য তৈরি ভাষাগত সমস্যা।

যাদের জন্য স্পিচ থেরাপি:

উল্লেখিত সমস্যাগুলো কিছু রোগের জন্য বা ডিসঅর্ডারের জন্য দেখা দিতে পারে। সেসব ডিসঅর্ডারে যারা আক্রান্ত তাদের জন্যই স্পিচ থেরাপি।এখানে ডিসঅর্ডার গুলো উল্লেখ করা হলো:

অটিজম:

অটিজম একটি স্নায়বিক বিকাশ সংক্রান্ত রোগ যার ফলে সামাজিক যোগাযোগে সমস্যা, ভাষা বুঝতে ও প্রকাশ করতে সমস্যা হয়। এতে আক্রান্ত ব্যাক্তিদের মধ্যে পুনরাবৃত্তিমূলক আচরন এবং নিজেকে নিজের মধ্যে গুটিয়ে রাখার প্রবনতা দেখা দেয়।

ডাউন সিনড্রোম:

এটি একটি জিনগত সমস্যা, যা ক্রোমোজোমের অসংগতির জন্য হয়ে থাকে। ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়।এবং তাদের ভাষাগত, শারীরিক ও মানসিক বিকাশ স্বাভাবিকের তুলনায় খুব ধীর গতিতে হয়।

সেরিব্রাল পালসি:

সেরিব্রাল পালসি একটি স্নায়বিক সমস্যা যা বাচ্চার জন্মের সময়, আগে বা পরে ব্রেইনের কোনো আঘাতের জন্য হতে পারে। এর ফলে শিশুদের শ্রবন প্রতিবন্ধকতা, দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতা, অনমনীয় পেশী, বাক ও যোগাযোগে সমস্যা সহ বুদ্ধিমত্তায় সমস্যা দেখা দেয়।

শ্রবন প্রতিবন্ধী:

জন্মগতভাবে অনেকের শ্রবন সমস্যা থাকে। বিভিন্ন হিয়ারিং এইড ব্যবহারের মাধ্যমে তারা তাদের শ্রবন ক্ষমতা ফিরে পেতে পারে কিন্তু ভাষাগত মাইলস্টোনের দিক থেকে কিছুটা পিছিয়ে পড়ে।প্রথমদিকে তাদের শব্দ ও ভাষা শোনা ও বোঝার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা থাকে।

এডিএইচডি:

এটেনশন ডেফিসিট হাইপার অ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার হচ্ছে একটি মানসিক সমস্যা। যার প্রধান লক্ষন হচ্ছে মনোযোগের অভাব, অতিরিক্ত চঞ্চলতা এবং চিন্তাভাবনায় অক্ষমতা। এ কারনেই এদের মধ্যে ভাষা ও যোগাযোগ সম্পর্কিত নানা সমস্যা দেখা দেয়।

লার্নিং ডিসেবিলিটি:

এটি একটি মানসিক সমস্যা যার ফলে শিশুদের লেখাপড়া কেন্দ্রিক নানা সমস্যা দেখা দেয়। এর প্রধান তিনটি ধরণ হচ্ছে: পড়তে না পারা (Dyslexia), লিখতে না পারা (Dysgraphia) এবং অংক করতে না পারা (Dyscalculia)।

তালু ও ঠোঁট কাটা:

জন্মগতভাবে অনেক শিশুর ঠোঁট ও তালু কাটা থাকে। তাদের চিকিৎসার পরেও অনেক সময় তারা বাকপ্রত্যঙ্গ ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারেনা। যার ফলে দেখা দেয় উচ্চারনে সমস্যা।

তোতলামি:

জিনগত, পরিবেশগত ও মানসিক কারনে তোতলামি হতে পারে। যার ফলে কিছু মানুষ একই ধ্বনি বা শব্দ বারবার উচ্চারণ করে, কখনো কখনো একটা শব্দকে অনেক দীর্ঘ করে বলে অথবা কথা বলার সময় বারবার আটকে যায়।

এফেজিয়া:

মস্তিস্কে আঘাত অথবা স্ট্রোকের ফলে অনেকের এফেজিয়া দেখা দেয়।যার ফলে ব্যক্তি ভাষা বুঝতে এবং ব্যবহার করতে সমস্যার সম্মুখীন হয়।

ডিসফেজিয়া:

মস্তিষ্কের কোনো সমস্যা বা গলায় কোনো সমস্যার জন্য এটি হতে পারে। এর প্রধান লক্ষন হচ্ছে খাবার গিলতে না পারা অথবা গলায় খাবার আটকে যাওয়া।

কণ্ঠ ও কন্ঠস্বরের সমস্যা:

এটি জন্মগত, মানসিক ও ব্যবহার জনিত নানা কারনে হতে পারে। অনেকের গলার স্বর বসে যাওয়া, স্বর পাল্টে যাওয়া, ফ্যাসফ্যাসে আওয়াজ হওয়া সহ পলিপ, নডিউলের মতো সমস্যাও হতে পারে।

অ্যাপ্রাক্সিয়া:

অ্যাপ্রাক্সিয়া হচ্ছে একটি স্নায়বিক সমস্যা যার ফলে বাকপ্রত্যঙ্গ ব্যবহারের জন্য যে পরিকল্পনা দরকার সেটা করার অক্ষমতা দেখা দেয়।

ডিসারথ্রিয়া:

এরফলে বাকপ্রত্যঙ্গ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারে সমস্যা দেখা দেয়। এটি মূলত একটি স্নায়বিক সমস্যা।

শারীরিক নানা রোগের জন্য যেমন আমরা ডাক্তারের সহায়তা নেই, ঠিক তেমনিই ভাষা ও যোগাযোগ সম্পর্কিত সমস্যায়ও আমাদের স্পিচ থেরাপিস্টের সহায়তা নেয়া উচিত।স্পিচ থেরাপিই পারে একজন মানুষকে তার স্বাভাবিক যোগাযোগ ও ভাষাগত সক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে।

মোসা: মেহেরুন্নেছা মীম
যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here