শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীক কোন ঝামেলায় বা সংকটে একটি বিষয় সবসময় সামনে চলে আসে এবং কোন বিবাদের সকল পক্ষের কন্ঠই এ ব্যাপারে সরব থাকে। বিষয়টি “সাধারণ শিক্ষার্থী” সম্প্রদায়। যারা পড়ালেখা করে তারা সবাই শিক্ষার্থী। তাহলে এই সাধারন শিক্ষার্থীর বিষয়টা কি? সাধারন শিক্ষার্থী হিসেবে যারা নিজেদের দাবী করে তারা এর কোন সংজ্ঞা না দিলেও তাদের চরিত্র এবং কর্মকান্ড দেখেশুনে একজন সাধারণ শিক্ষার্থী হওয়ার শর্তাবলী সম্পর্কে ধারনা পাওয়া যায়–একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর প্রধান কাজ পড়াশুনা করা। তার রাজনৈতিক জ্ঞান থাকতে পারে তবে তা প্রকাশ করা যাবে না।

তাকে রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে হবে এবং তার চিন্তার পরিধি তার পরিবার অর্থাৎ বাবা, মা, হবু বউ এর বাইরে নেয়া যাবে না এবং তাকে বিসিএসএর স্বপ্ন দেখতে হবে। তবে এর ব্যাতিক্রম আছে এবং সংখ্যায় তারা এত নগণ্য যে তাদের উদাহরন না টানলেও তারা প্রতিবাদ করার মত জায়গায় নাই। অসাধারন শিক্ষার্থী বলে কেউ নিজেদের দাবী করে না বা কেউ কাউকে অসাধারন বলে গালিও দেয়া হয় না ।তবে সাধারনের বিপরীত শব্দ যখন অসাধারণ তখন কিছু শিক্ষার্থীকে অসাধারণ বলে ধরে নেওয়া যায়। এই দলে আছে যারা রাজনীতি করে (সক্রিয় বা আধা সক্রিয়) এবং যারা বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক জ্ঞান মাঠে ময়দানে প্রদর্শন করে।

সাধারন–অসাধারনের এই ব্যাপারটি আরও ভালভাবে বোঝ যায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান আন্দোলনের দিকে একটু নজর দিলে। আন্দোলন কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা এখন চার ভাগে বিভক্ত। একদল আন্দোলনের পক্ষে, অন্যদল বিপক্ষে (এরাই কথিত সাধারনদের ভাষায় কথিত অসাধারন)। সাধারণ শিক্ষার্থী সমাজের মধ্যে আবার দুই ভাগ। এক ভাগ আন্দোলনকে নৈতিকভাবে সমর্থন বা বিরোধীতা করে অর্থাৎ তারা ফেসবুকে এবং চায়ের দোকানে সক্রিয়। আরেকদল এসব নিয়ে চিন্তা করতেই অপারগ, তাদের যাবতীয় চিন্তা চেতনা তাদের লাইব্রেরী এবং টিউশনের দিকে আবদ্ধ। ক্লাস পরীক্ষার দিকেও তাদের নজর আছে তবে তা লাইব্রেরী-টিউশনির থেকে বেশি না। এরাই এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ।

আন্দোলনের পক্ষে বিপক্ষে উভয় পক্ষই দাবী করে এই সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের পক্ষে। অবশ্য সাধারন শিক্ষার্থীরা যে কার পক্ষে তা তারা জানে না বা জানলেও বুঝতে দেয় না। এরকম একটি পর্যায়ে এসে আন্দোলনকারী কেউ কেউ সাধারন শিক্ষার্থীদের তাদের নির্লিপ্ততার জন্য কাঠগড়ায় দাড় করাচ্ছেন এবং তাদের যুক্তিও খারিজ করার মত না। কারন, এই ব্যাপারটি আসলেই মারাত্মক যে , দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা নিতে আসা ব্যাক্তিদের সব থেকে বড় অংশটি সব ধরনের রাজনৈতিক, সামাজিক কর্মকান্ড তো দূরে থাক, চিন্তা থেকেও নিজেকে দূরে রাখতে ভালবাসে। তবে, এই দায় শুধু এই “সাধারন শিক্ষার্থী” সমাজকে দেয়া যায় না।

বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়ে তাদের একটি বড় অংশই নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছে। ছোটবেলা থেকে যে কথাগুলো তাদের কানের চারপাশে সবসময় ঘুরেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হলো–ভাল করে পড়ো, এই কলেজে ভর্তি হতে হবে, ভাল করে পড়ো, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হবে, এই সাব্জেক্ট এ পড়তে হবে, ঝামেলা করা যাবে না। দেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিটি পরিবারেরই চিন্তা নিজস্ব ভাল থাকার মধ্যেই গড়ে উঠেছে, কারন এর বাইরে চিন্তা করার বিপদ অজস্র। আমাদের তৈরীই করা হয়েছে আমলা হওয়ার জন্য, চিন্তা করাকে বা স্রোতের বিপরীতে হাটাকে অপরাধ হিসেবে চিন্তা করতে বাধ্য করা হয়েছে আমাদের বাবা মায়েদের এবং আমাদের এবং এরই ফল আমরা দেখতে পাচ্ছি। জাহাঙ্গীরনগর শুধু একটি ছোট উদাহরন যা বাংলাদেশের সামগ্রিক চেহারারই সংক্ষিপ্ত রূপ। এর মূলে আছে ব্যাবসায়ী জনগোষ্ঠী যাদের প্রচূর পরিমানে কর্মী দরকার, আছে রাজনৈতিক গোষ্ঠী যাদের প্রচূর পরিমানে নিবেদিত প্রাণ কর্মী দরকার।

কিন্তু, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি দেশের অন্যান্য স্থানগুলোর থেকে একটূ হলেও আলাদা। কারন এখানে মানুষ চিন্তা করার, চিন্তাকে কর্মে রূপ দেয়ার সুযোগ পায় বলেই আমাদের ধারনা ছিল। তবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখানে ব্যার্থ যে তারা একটি প্রজন্মকে নির্লিপ্তভাবে বেড়ে উঠার সুযোগ দিচ্ছে এবং তারাও এই নির্লিপ্ততাকে তাদের কাজে লাগাচ্ছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাপটে কে দোষী, কে নির্দোষ সে মীমাংসা এখনও হয়নি। হয়তো শীঘ্রই হবে। তবে, এই সংকটের সবথেকে বড় শিক্ষা হলো একটি বিশাল সংখ্যক মানুষ রাজনৈতিকভাবে নির্লিপ্ত এবং তারা এতেই সুখী আছে বা তাদের এভাবেই সুখী থাকতে বাধ্য করছে এই সমাজব্যাবস্থা। এটা এই দেশের জন্য, বাঙালী জাতির জন্য অশনিসংকেত কারন তারাই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিভিন্ন জায়গায় থাকবে। তাদের হাতেই নিয়ন্ত্রিত হবে পররাষ্ট্রনীতি, স্বরাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি। এই যে নির্লিপ্ততা, এই যে দায়বদ্ধহীনতা, এই চরিত্র তারা আজীবন বয়ে বেড়াবে এবং তাদের এই চরিত্রের জন্য অমঙ্গল হবে দেশের। এই দায় এই সমাজব্যাবস্থার, দায় রাষ্ট্রের, দায় আমাদের শিক্ষকদের যারা পর্যাপ্ত সময় এবং সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও তাদের শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্ক চর্চার বদলে অর্থ চর্চার সেই নির্লিপ্ততাই শিক্ষা দিয়েছেন প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে।

লেখক: ফাইজার মুহাম্মাদ শাওলীন, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। স্টুডেন্ট জার্নাল-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here