ঢাকা | সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

হামলা-মামলা পেরিয়ে দক্ষিণ যুবদলের সভাপতির আলোচনায় জবির আসলাম

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্ব নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা যখন তুঙ্গে, তখন তৃণমূল থেকে সভাপতি পদে আলোচনার শীর্ষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ছাত্রদলের সাবেক সফল সভাপতি মো. আসাদুজ্জামান আসলাম। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা এবং দুঃসময়ে সংগঠনকে ধরে রাখার সক্ষমতার কারণে তৃণমূল নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশের আস্থার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন তিনি।

দলীয় সূত্র বলছে, আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলোতে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া জোরদার হয়েছে। গত ৯ মে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কেন্দ্রীয় বিএনপি এবং বিভিন্ন ইউনিটের প্রায় ৯০০ নেতার সঙ্গে বৈঠকে সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার নির্দেশ দেন। ওই বৈঠকের পর থেকেই মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ যুবদলের নেতৃত্বে পরিবর্তনের আলোচনা শুরু হয়।

এই প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় উঠে আসে কয়েকজন তরুণ ও মাঠপর্যায়ের নেতার নাম। তবে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন আসাদুজ্জামান আসলাম। নেতাকর্মীদের ভাষ্য, তিনি কোনো ধরনের প্রকাশ্য তদবির বা লবিংয়ের বদলে নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা ও ত্যাগের কারণেই আলোচনায় এসেছেন।

জানা যায়, ২০০৪-০৫ শিক্ষাবর্ষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় হন আসলাম। গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে নিজের খরচ চালাতেন। ধীরে ধীরে সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের নেতৃত্বে আসেন।

দলীয় নেতাকর্মীদের দাবি, তার নেতৃত্বে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী ও নিয়ন্ত্রিত ইউনিটে পরিণত হয়। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের রাজনৈতিক সহিংসতার পর বিরোধী ছাত্ররাজনীতি যখন অনেকটা স্থবির হয়ে পড়ে, তখনও ক্যাম্পাসে সক্রিয় ছিল জবি ছাত্রদল। পরে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানেও ইউনিটটির সক্রিয় উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য।

বিশেষ করে ৪ আগস্ট সিএমএম আদালত ঘেরাও কর্মসূচিতে আসলামের নেতৃত্ব আলোচনায় আসে। এছাড়া ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পুরান ঢাকার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা নিশ্চিতে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখার উদ্যোগও প্রশংসিত হয়।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে হামলা, মামলা ও নির্যাতনের ঘটনাও রয়েছে তার অভিজ্ঞতায়। দলীয় সূত্র জানায়, ছাত্রলীগের হামলায় আহত হওয়া, পুলিশের লাঠিচার্জে কানের পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং গুলিবিদ্ধ হওয়ার মতো ঘটনাও মোকাবিলা করেছেন তিনি। সর্বশেষ ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন আসলাম।

তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মনে করছেন, মহানগর দক্ষিণ যুবদলের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব প্রয়োজন। তাদের মতে, আসাদুজ্জামান আসলামের মতো সাংগঠনিকভাবে পরীক্ষিত কাউকে দায়িত্ব দিলে যুবদল আরও গতিশীল হতে পারে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন ছাত্রনেতা আসলামের অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, “ছাত্রদলের চরম দুঃসময়ে আসলাম অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। প্রতিটি আন্দোলন ও সংগ্রামে তার অবদান ছিল অপরিসীম। প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝেও অনন্য মেধা, সততা ও অসাধারণ বিনয় তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা এবং সমাদৃত করে তুলেছে।”

একইভাবে আসলামের ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন বলেন, “আসলামের মতো বিনয়ী ও অমায়িক ছাত্রনেতা সমসাময়িক রাজনীতিতে সত্যিই বিরল। একাধারে মেধাবী ও কঠোর পরিশ্রমী এই তরুণের মাঝে নেতৃত্বের সকল গুণাবলি বিদ্যমান। আমি শুনেছি ছাত্ররাজনীতি করার পাশাপাশি সে টিউশনি করত, যা আজকের তরুণদের জন্য নীতিবান হওয়ার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।”

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. ইমরানুল হক বলেন, “আসলাম অত্যন্ত ভদ্র, মানবিক ও মিশুক একজন মানুষ। একজন ছাত্রনেতার মধ্যে যে গুণাবলি থাকা প্রয়োজন, তার প্রায় সবই তাঁর মধ্যে রয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, তিনি শিক্ষিত, মার্জিত ও শিষ্টাচার সম্পর্কে অবগত। কাকে কীভাবে সম্মান করতে হয়, ছোটদের প্রতি কীভাবে স্নেহ দেখাতে হয় এবং বড়দের কীভাবে মর্যাদা দিতে হয়—এসব বিষয়ে তিনি অন্যদের জন্য অনুসরণীয় উদাহরণ।

তিনি আরও বলেন, অন্য নেতাদেরও আসলামের কাছ থেকে এসব গুণ শেখা উচিত। তিনি নেতা হিসেবে একটি রোল মডেল ছিলেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তিনি একজন মূল্যবান সম্পদ (অ্যাসেট) ছিলেন। ভবিষ্যতেও যদি এ ধরনের মানবিক, শিক্ষিত ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব সামনে আসে, তাহলে তারা দেশ ও সমাজের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। দেশ ও জাতির জন্য এমন নেতৃত্বেরই প্রয়োজন।”

আসাদুজ্জামান আসলাম বলেন, “আমি পদকে লক্ষ্য হিসেবে দেখি না। সংগঠনের জন্য কাজ করাটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। রাজপথে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে শরীরের প্রতিটি টিস্যুর রন্ধ্রে রন্ধ্রে রাজনৈতিক সক্রিয়তার অক্লান্ত পরিশ্রমের অভাবনীয় চাপ। যার যন্ত্রণাময় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া লাগবের লক্ষ্যে শরীরে একাধিক অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে এবং এখনো চিকিৎসা চলমান। অসংখ্যবার হামলা মামলার শিকার হয়েছি। এখন দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। দল যদি আমাকে কোনো দায়িত্ব দেয়ার উপযুক্ত মনে করে তাহলে আমি সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।”

আসলাম আরও বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির সময় যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, সেটি কাজে লাগিয়ে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী ও নেতাকর্মীবান্ধব করার চেষ্টা থাকবে। এছাড়াও তরুণদের সংগঠিত করা, নেতাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার দিকে গুরুত্ব দিতে চাই।”