মাত্র ১৫০০ টাকা আর একটি মোটরসাইকেলের লোভে নিজের ব্যবসায়িক পার্টনারদের হাতেই নৃশংসভাবে খুনের শিকার হয়েছেন পুরাতন মোবাইল ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম। চাঞ্চল্যকর ও ক্লুলেস এই হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মূল রহস্য উদঘাটন করেছে নওগাঁ জেলা পুলিশ।
শনিবার (১৩ জুন) দুপুরে নওগাঁ সদর মডেল থানা চত্বরে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের এসব তথ্য জানান জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম।
ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দুই ঘাতককে গ্রেফতার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে নিহতের ব্যবহৃত দুটি মোবাইল, ছিনতাই হওয়া মোটরসাইকেল ও দেশীয় অস্ত্র। ইতিমধ্যে গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে একজন আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন, নওগাঁ সদর উপজেলার ভীমপুর পাঠাকাটা এলাকার সিদ্দিকুর রহমানের ছেলে জয়নুল (৩৫) এবং মান্দা উপজেলার সতীহাট শ্রীরামপুর এলাকার এরশাদ আলীর ছেলে আশরাফুল (২৬)।
হত্যাকাণ্ডের শিকার শফিকুল ইসলাম জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার তিলকপুর গ্রামের আজিজার রহমানের ছেলে। তিনি নওগাঁ ও আশপাশের এলাকায় ঘুরে ঘুরে পুরাতন মোবাইল ও ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী কেনাবেচার ক্ষুদ্র ব্যবসা করতেন।
পুলিশ জানায়, গত ৮ জুন ব্যবসায়িক কাজের কথা বলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আর ফেরেননি শফিকুল ইসলাম। ৯ জুন বিকেল থেকে তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়ায় পরিবারের পক্ষ থেকে ওই দিনই নওগাঁ সদর থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। জিডির সূত্র ধরে মূলত সেদিন থেকেই ছায়া তদন্ত শুরু করে পুলিশ।
এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে সদর উপজেলার বারমাসি বিলে কচুরিপানার নিচে একটি লাশ ভাসতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেয়। তাৎক্ষণিকভাবে অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বিষয়টি পুলিশ সুপারকে অবহিত করলে তার নির্দেশনায় পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। পরবর্তীতে সুরতহাল ও আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) পরীক্ষার মাধ্যমে লাশটি নিখোঁজ শফিকুলের বলে শনাক্ত করা হয়। ওই দিনই থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।
মামলা দায়েরের পর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) জয়ব্রত পাল এবং সদর থানার ওসি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান এর সমন্বয়ে একটি চৌকস টিম মাঠে নামে। তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন সোর্সের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে নওগাঁ শহর থেকে জয়নুলকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তার দেওয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী মান্দা থেকে আশরাফুলকে গ্রেফতার করা হয়। জয়নুলের কাছ থেকেই নিহতের দুটি মোবাইল উদ্ধার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জানায়, শফিকুল ও তারা একসঙ্গে ব্যবসা করতেন। শফিকুলের ব্যবসায় ভালো লাভ হচ্ছিল এবং তার কাছে সবসময় মোটা অঙ্কের টাকা থাকে, এমন ধারণা থেকে এবং ঈর্ষান্বিত হয়ে গত ৭ জুন মান্দার সতীহাট এলাকায় বসে শফিকুলকে হত্যার পরিকল্পনা করেন জয়নুল, আশরাফুল ও তাদের আরেক সহযোগী।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৮ জুন শফিকুলকে মোবাইল ব্যবসার কথা বলে ভীমপুর কলেজ মোড়ে ডেকে আনা হয়। পরে দুটি মোটরসাইকেলে করে চারজন বারোমাসি বিলের পাথরঘাটি ব্রিজের ওপরে যান। সেখানে নির্জনতার সুযোগ নিয়ে হঠাৎ করেই পলাতক আসামিটি পেছন থেকে নাইলনের রশি দিয়ে শফিকুলের গলায় ফাঁস দিয়ে টান দেয়। এ সময় জয়নুল শফিকুলের হাত এবং আশরাফুল তার পা চেপে ধরে মাটিতে ফেলে দেন। শফিকুল নিস্তেজ হয়ে পড়লে মৃত্যু নিশ্চিত করতে তারা লাশটিকে বিলের পানিতে নিয়ে বেশ কয়েকবার চুবান। এরপর লাশটি কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে রেখে শফিকুলের মোটরসাইকেল এবং পকেটে থাকা মাত্র ১৫০০ টাকা নিয়ে তারা পালিয়ে যান। পরে টাকা ও মোটরসাইকেল নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে এসপি তারিকুল ইসলাম বলেন, “এটি একটি অত্যন্ত বর্বরোচিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড। মাত্র সামান্য কিছু টাকা আর একটি মোটরবাইকের জন্য ব্যবসায়িক পার্টনাররা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। মামলা হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আমরা দুই আসামিকে গ্রেফতার ও মালামাল উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। একজন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।”
তিনি আরও জানান, এই চক্রের সাথে জড়িত অপর পলাতক আসামিকে গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নওগাঁ জেলা পুলিশ যেকোনো অপরাধের অপরাধী গ্রেফতার এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম, জয়ব্রত পাল ও সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানসহ জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।







