শুধু না খেয়ে থাকাই রোজা নয়

মহান আল্লাহ তাআলার অপার কৃপায় পবিত্র মাহে রমজানের রোজাগুলো সুস্থতার সাথে অতিবাহিত করার তাওফিক লাভ করছি, আলহামদুলিল্লাহ।

আমাদের সবার আত্মবিশ্লেষণ করা উচিত, আমরা যে আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টির জন্য রোজাগুলো পালন করছি আসলেই কি আমরা এ দিনগুলোতে আল্লাহর নির্দেশমত জীবন পরিচালিত করছি?

আমরা কি মিথ্যাসহ সব পাপ থেকে বিরত থাকছি? আমরা কি আল্লাহর ধ্যানে কিছুটা সময় অতিবাহিত করছি? যদি আমাদের উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে এই রোজা রাখা তথা পানাহার থেকে বিরত থাকা আমাদের কোনো কাজে আসবে না।

কেননা রোজা মানুষের মাঝে এক ধরনের বিনয়, ধৈর্যসহ সব পাপমুক্ত এবং সহ্য ক্ষমতা সৃষ্টি করে। আর রোজার মাধ্যমে মানুষ তার নিজের নাফসের সংশোধনও করে নেয়। তাদের জন্য রোজা নয়-
– যারা রোজা রেখে বৃথা কাজকর্ম করে।
– বিভিন্ন পাপ কাজ করে।
– মিথ্যা কথা বলে।
– অন্যকে ধোকা দেয়।
– ব্যবসায় অধিক মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করে।
– খাদ্য সামগ্রী মজুদ রেখে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে।
– অপরের সম্পদ হরণের চেষ্টা করে।
– আল্লাহর ও বান্দার অধিকার আদায় করে না।
– প্রতিবেশীর খোঁজ রাখে না।

এসব ব্যক্তির রোজা পালন হচ্ছে শুধুমাত্র উপবাস থাকারই নামান্তর।

একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো রোজার মাধ্যমে আল্লাহভীতি অর্জনের চেষ্টা করা এবং ধীরে ধীরে নিজের রোজার স্তরকে উন্নীত করা। কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকার নামই রোজা নয় আর তাৎপর্যহীন রোজা মানুষের পার্থিব ও অপার্থিব কোনো কাজে আসে না।

আমাদের প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলা এবং এর ওপর আমল করা থেকে বিরত থাকে না আল্লাহ তাআলার জন্য তার উপবাস থাকা এবং পিপাসার্ত থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ তার রোজা রাখা বেকার বলে গণ্য হবে।’ (বুখারি)

মানুষ যখন রোজার প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে গাফেল হয়ে যায় তখন সে শুধু নিজেকে উপবাসই রাখে যা আল্লাহ তাআলার কোনো প্রয়োজন নেই। আল্লাহ মানুষের অন্তর দেখেন, কোন নিয়তে সে রোজা রাখছে এটাই মূল বিষয়। অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
‘কত রোজাদার আছে, যাদের রোজার বিনিময়ে ক্ষুধা ছাড়া আর কিছুই জোটে না। কত নামাজ আদায়কারী আছে, যাদের রাত (জেগে নামাজ) জাগরণ ছাড়া আর কিছুই জোটে না।’ (ইবনে মাজাহ)

হজরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের জিহ্বা, চোখ, কানসহ অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে সংযত করতে পারে না তার রোজা কোনো কাজেই আসবে না।’ (বিহারুল আনওয়ার)

কোনো ব্যক্তির কেবলমাত্র অভুক্ত-পিপাসার্ত থাকাই রোজার মূল উদ্দেশ্য নয়। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
‘তোমাদের কেউ যখন কোনো দিন রোজা রাখে, সে যেন অশ্লীল কথা না বলে এবং গোলমাল-ঝগড়াঝাটি না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা কেউ তার সাথে ঝগড়াঝাটি করে তবে তার বলা উচিত- আমি রোজাদার।’ (বুখারি)

প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্য বর্ণনায় বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রোজাদার; সে যদি চুপ থাকে তাহলে সেটাও তার জন্য ইবাদত। তার ঘুমও ইবাদত হিসাবে গণ্য করা হবে। তার দোয়া গ্রহণযোগ্য হবে। আর তার আমলের প্রতিদান বাড়িয়ে দেয়া হবে।’

পরিশেষে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে-
‘রোজা সেইভাবে রাখতে হবে যাতে আল্লাহ পাক আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন। আসলে মুমিন-মুত্তাকি যারা আন্তরিকতার সাথে রোজা রাখে আর তাদের চেহারায় এক পবিত্র পরিবর্তন সৃষ্টি হয়, তাদের আত্মা নূরানি হয়ে যায় এবং তার জন্যই জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হয় আর শয়তানকেও শিকল দিয়ে বেধে রাখা হয়। কিন্তু কোনো রোজাদার যদি রমজানের কল্যাণ লাভ করতে না পারে তবে তার সাহরি আর ইফতার কোনো কাজে আসবে না।

আসুন, রমজানের দিনগুলোকে কাজে লাগাই, অনেক বেশি ইবাদত-বন্দেগিতে রত ইহ, বেশি বেশি দোয়া-দুরূদ পাঠ করি, আল্লাহর স্মরণে নিজেকে নিয়োজিত করি আর ফিতরা, ফিদিয়াসহ অধিকহারে দান-সাদকা করি।

আমরা যদি এমনটি করতে পারি তবেই এ রমজানে আমাদের আত্মা হয়ে ওঠবে প্রশান্তিময়। আর তাতে আল্লাহ পাক হয়তো আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে সব বালা-মুসিবত দূর করে দিবেন। হে দয়াময় প্রভু! পবিত্র রমজান মাসের রহমত ও বরকত থেকে তুমি আমাদের কল্যাণমণ্ডিত কর। আমিন।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here