ঢাকা | মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬,২৯ বৈশাখ ১৪৩৩

স্কুলের হাজিরা খাতায় শিক্ষিকার স্বাক্ষর, ক্লাস নিচ্ছেন দাখিল পাস ছেলে!

চাঁদপুরে ফরিদগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ বদরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ে শিক্ষকের হাজিরা খাতায় সহকারী শিক্ষক মা ফাতেমা বেগমের স্বাক্ষর থাকলেও শ্রেণিতে পাঠদান করাচ্ছেন মিরাজুন্নবী সিয়াম নামে সদ্য আলিমে ভর্তি হওয়া তার ছেলে।

সম্প্রতি ফরিদগঞ্জের ১৫২নং দক্ষিণ বদরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে।

জানা যায়, মিরাজুন্নবী সিয়াম নিজেও একজন শিক্ষার্থী। স্থানীয় একটি মাদ্রাসা থেকে গত বছরে দাখিল পাস করা এই তরুণ বর্তমানে রাজধানী ঢাকার দারুননাজাত সিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসায় আলিম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছেন। অথচ নিজের পড়াশোনা বাদ দিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিচ্ছেন তিনি।

এই বিষয়ে কয়েকজন অভিভাবক জানান, গত কয়েক মাস ধরেই মাঝেমধ্যে বিদ্যালয়ের ওই শিক্ষকের পরিবর্তে তার ছেলেকে পাঠদান করতে দেখা যাচ্ছে।

অভিভাবকদের প্রশ্ন, একজন সদ্য দাখিল পাস করা শিক্ষার্থী কীভাবে একটি সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেন?

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিক্ষিকা ফাতেমা বেগম অসুস্থতাজনিত কারণে দেশে ও দেশের বাইরে চিকিৎসা নিয়েছেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে চিকিৎসাজনিত কারণে ভিন্ন সময়ে বিশ্রামে ছিলেন। তবে এই সময়ে তিনি সরকারি বিধি অনুযায়ী ছুটি নিয়েছিলেন কিনা, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি। সে সময়েও তার ছেলেকে দিয়ে পাঠদান করিয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন মিরাজুন্নবী সিয়াম নিজেই।

সম্প্রতি ওই শিক্ষকের পরিবর্তে সিয়ামের পাঠদানের দিনগুলোতে হাজিরা খাতায় ঠিকই ওই সহকারী শিক্ষিকের স্বাক্ষর ছিল। তিনি পাঠদান না করালেও প্রতিদিনই স্কুলে এসে শিক্ষক হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করার বিষয়টি নিশ্চিত করেন ফাতেমা বেগমের সহকর্মীরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থেকেই দীর্ঘদিন ধরে এমন অনিয়ম চালিয়ে আসছেন ওই শিক্ষিকা। কেউ কেউ বলেন, ওই শিক্ষিকার এক প্রভাবশালী আইনজীবী থাকায় প্রশাসনিকভাবে বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি।

এক অভিভাবক বলেন, একজন অভিজ্ঞ শিক্ষকের জায়গায় সদ্য দাখিল পাস করা ছেলে যদি ক্লাস নেয়, তাহলে শিশুদের শিক্ষার মান কীভাবে নিশ্চিত হবে? সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুমোদিত শিক্ষক ছাড়া অন্য কারও পাঠদান করা শিক্ষা নীতিমালা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী। এ ঘটনায় একাধিক সচেতন অভিভাবক ও স্থানীয়দের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

এ বিষয়ে কথা হয় অভিযুক্ত শিক্ষিক ফাতেমা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার অসুস্থতার কারণে ছেলে ক্লাস নিচ্ছে। তার ছেলের ক্লাস করানো যথার্থ হচ্ছে কিনা—এমন প্রশ্নের বিপরীতে তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেননি। যদি অসুস্থ হয়েই থাকেন, তবে কেন ছুটি নিলেন না—এ প্রশ্নের বিপরীতেও তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেননি।

আপনি স্কুলে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন, তার বিপরীতে আপনার ছেলে অপরিপক্বভাবে পাঠদান করাচ্ছ—এটি নিয়মবহির্ভূত এবং স্পষ্ট প্রতারণা কিনা? এমন প্রশ্ন করতেই তিনি প্রতারণার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আমার ভুল হয়ে গেছে।’

পঞ্চম শ্রেণির ইংরেজি ক্লাস শেষ করে শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হলে, মিরাজুন্নবী সিয়ামকে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান করাতে পারেন কিনা। এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মায়ের অসুস্থতার জন্য আমি ক্লাস নিচ্ছি। গত বছরও মায়ের অসুস্থতার সময় প্রায় দেড়-দুই মাস আমি ক্লাস করিয়েছি। এখন আবার অসুস্থ, তাই এখন ক্লাস করাচ্ছি।’

গত শনিবার (৯ মে) দুপুরেও মিরাজুন্নবী সিয়ামকে দিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের বিষয়ে জানতে দক্ষিণ বদরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফারহানা আক্তারের বক্তব্যের জন্য যাওয়া হলে, সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে তড়িঘড়ি করে মোবাইল ফোনে কেউ একজনকে কল দেন। এরপর ফোনে কথা বলা শেষ হলে, মিরাজুন্নবী সিয়াম ক্লাস করার অনুমতি তিনি দিতে পারেন কিনা—এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবো না। নিউজের পর কর্তৃপক্ষ আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক।’

এ বিষয়ে বিস্তারিত আরও জানতে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শিরিন সুলতানার সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয়; তিনি বলেন, ‘আমি একটা প্রোগ্রামে এসেছি। শিক্ষিক পরিবর্তে ছেলে ক্লাস নেয়ার বিষয়টি জেনেছি। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এ বিষয়ে চাঁদপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুহাম্মদ মোছাদ্দেক হোসেন জানান, আমি আপনার মাধ্যমে এখন বিষয়টি জেনেছি। তাই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পর আজই ওই সহকারী শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হবে।