মুখের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। মুখে দুর্গন্ধ হলে তা যেমন পরিবেশ নষ্ট করে, তেমনি মানুষের জন্য কষ্টের কারণ হয়। তাই রাসুল (সা.) কাঁচা পেঁয়াজ-রসুন খেয়ে মসজিদে যেতে বারণ করেছেন। এমনকি এভাবে মুখে দুর্গন্ধ নিয়ে কেউ মসজিদে প্রবেশ করে তাকে বের করে দিতে বলেছেন। (মুসলিম, হাদিস ৫৬৭)

হাদিসে কুদসিতে আছে, রাসূল সা. বলেন— যার হাতে আমার প্রাণ, তার শপথ , রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ মেশকের তুলনায় আল্লাহ তাআলার নিকট অধিক প্রিয় ; সে আমার উদ্দেশে তার পানাহার ও প্রবৃত্তিকে পরিত্যাগ করে, রোজা আমার জন্য, আমিই তার প্রতিদান। পুণ্যকর্মের প্রতিদান দশগুণ। (বুখারি, হাদিস ১৮৯৪)

ভিন্ন শব্দে একই হাদিস এসেছে এভাবে— আদম সন্তানের যাবতীয় আমলই বৃদ্ধি পায়। পূন্যকর্মের প্রতিফল দশ থেকে সাত শত গুণ বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন : …তবে রোজা এর ব্যতিক্রম, নিশ্চয় তা আমার জন্য, আমিই তার প্রতিদান। রোজাদার তার প্রবৃত্তি ও পানাহার পরিত্যাগ করেছে আমার জন্য। রোজাদারের আনন্দের মুহূর্ত দুটি—ইফতারকালিন ও রবের সাথে সাক্ষাৎকালীন। নিশ্চয় তার মুখের দুর্গন্ধ মেশকের সুগন্ধি হতেও আল্লাহর নিকট অধিক উত্তম। (মুসলিম, হাদিস ১১৫১)

তবে এর অর্থ এ নয় যে রোজাদার মুখ অপরিষ্কার রাখবেন। বরং রোজাদার নিজেকে আল্লাহর সন্নিধানে পেশ করার জন্য পবিত্র, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং পরিপাটি থাকবেন। যাদের মুখ থেকে কোনো কারণে দুর্গন্ধ বের হয়, তারা অবশ্যই রমজান মাসে এই বিষয়ে বেশি সতর্কতা অবলম্বন করবেন। যাতে তার মুখের দুর্গন্ধের কারণে অন্য কোনো রোজাদারের কষ্ট না হয়; রোজার ও রোজাদারের অসম্মান না হয়, সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখা উচিত।

অথচ একদল লোক বলে বেড়ান যে, রোজা অবস্থায় মুখ পরিষ্কার করা এবং মেসওয়াক করা মাকরুহ। নিশ্চিত তারা রমজানে রসূল সা.-এর জীবন যাপন পদ্ধতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। কেননা, রাসূল সা. রোজা রেখেও মেসওয়াক করতে ভুলতেন না, তিনি মুখের পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে যত্নবান ছিলেন। আমের ইবনে রাবিয়া রা. বলেন : আমি রাসূল সা.-কে অসংখ্যবার রোজাবস্থায় মেসওয়াক করতে দেখেছি। (তিরমিজি, হাদিস ৭২৫; হাদিসটি হাসান)

এমনিতেও তিনি মেসওয়াকের প্রতি অশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। হাদিসে এসেছে—মেসওয়াক মুখের জন্য পবিত্রকারী, এবং রবের সন্তুষ্টি আনয়নকারী। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস ৭; হাদিসটি সহি লিগাইরিহ)

অপর হাদিসে এসেছে— মেসওয়াকের ব্যাপারে আমাকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে, এমনকি, একসময় আমার মনে হয়েছিলো যে, এ ব্যাপারে আমার ওপর কোরআন কিংবা ওহি নাজিল হবে। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস ৩ ও ২২)

স্পষ্ট যে, রাসূল সা. পুরো দিবস জুড়েই মেসওয়াক করতেন। দিবসের সূচনা বা সমাপ্তির মাঝে পার্থক্য করতেন না। হাদিসে এসেছে— আমার উম্মতের উপর যদি বিষয়টি কঠিন না হতো, তবে প্রতি ওজুর সময় তাদের জন্য মেসওয়াক আবশ্যক করে দিতাম। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস ৯৯৩০)

অপর হাদিসে এসেছে— মোমিনদের জন্য যদি কষ্টকর না হতো, তবে প্রতি নামাজের কালে আমি তাদের জন্য মেসওয়াক আবশ্যক করে দিতাম। (মুসলিম, হাদিস ২৫২) মেসওয়াকের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে মসজিদ বা নামাজের কথা উল্লেখ করার কারণ হলো, ইবাদতে ও পাবলিক প্লেসে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা। নয়তো এর ফলে একই সঙ্গে আল্লাহ ও বান্দা উভয়ের হক নষ্ট হবে।

ইবনে আব্দুল বার বলেন : এ-হাদিস প্রমাণ করে, যে-কোনো সময় মেসওয়াক বৈধ। হাদিস দুটিতে রাসূল সা. ‘প্রতি ওজুকালে’ এবং ‘প্রতি নামাজ কালে’ বাক্যাংশ দুটি ব্যবহার করেছেন। নামাজ নির্দিষ্ট একটি সময়েই নয়, ওয়াজিব হয় দ্বিপ্রহর, বিকেল ও রাতের নানা সময়ে। (ইবনে আব্দুল বার, আত-তামহিদ, ৭/১৯৮)

ইমাম বুখারি রহ. এ-হাদিসের ভাষ্যে বলেন—রোজাদারকে এ হুকুমের আওতা-বহির্ভূত করা হয়নি। ইবনে খুজাইমা রহ. বলেন : হাদিস দ্বারা প্রমাণ হয় স্বাভাবিক অবস্থায় ব্যক্তির জন্য যেভাবে প্রতি নামাজের সময় মেসওয়াক করা ফজিলতের বিষয়, তেমনিভাবে ফজিলতের বিষয় রোজাদারের জন্যও। (সহিহ ইবনে খুজাইমা, ৩/২৪৭)

সুতরাং মেশকের সুঘ্রাণের চেয়েও আল্লাহর নিকট রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ অধিক প্রিয়।—হাদিসটির অর্থ হচ্ছে, রোজাদারের মুখের এ-গন্ধ, যাকে তোমরা দুর্গন্ধ বলে অবহিত কর, আল্লাহ তাআলার নিকট সেই মেশকের চেয়েও উত্তম, ভালো ও প্রিয়—যাকে তোমরা সুগন্ধি বলো।

কারণ, এ গন্ধ সৃষ্টি হয়েছে তার ইবাদত পালন ও আল্লাহ তাআলার হুকুমের অনুবর্তী হওয়ার ফলে। মুখের দুর্গন্ধ স্বভাবতই ভালো নয় এবং রোজা অবস্থায় তা দূর করতে কোথাও নিষেধ করা হয়েছে বলেও আমাদের জানা নেই। সুতরাং রোজা অবস্থায় মেসওয়াককে পূর্বসূরি আলেম কোনো দুষণীয় মনে করেন নি।

তবে কেউ কেউ কাঁচা ডাল দিয়ে মেসওয়াক করা এবং দিবস শেষে মেসওয়াক করাকে মাকরূহ মনে করেছেন। যদিও ভেজা ও শুকনা মেসওয়াকের মাঝে রাসূল পার্থক্য করেছেন—এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না।

তাই সালাফের অধিকাংশই এতে পার্থক্য করতেনও না। ইবনে সিরিন রহ.-এর নিকট কেউ এমন ভেজা মেসওয়াকের প্রসঙ্গ তুললে তিনি বলেন : এতে কোন অসুবিধা নেই, এ কেবল খেজুরের ডাল, এর স্বাদ রয়েছে। যেমন স্বাদ রয়েছে পানির, অথচ তা দিয়ে তুমি কুলি কর। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা, হাদিস ৯১৭১)

ইবনে উলয়া বলেন : রোজাদার কিংবা পানাহারকারী—উভয়ের জন্যই মেসওয়াক করা সুন্নত। মেসওয়াক শুকনা হোক কিংবা ভেজা—দুটোই সমান। (ইবনে আব্দুল বার, আত-তামহিদ, ৭/১৯৯)

আর যারা দিবসের শেষে মেসওয়াক মাকরুহ মনে করেন, তাদের মত হলো : দিনভর অভুক্ত থাকার ফলে দিবসের শেষান্তে রোজাদারের মুখে কিছুটা দুর্গন্ধ হয়—এই দুর্গন্ধই হাদিসের উদ্দেশ্য। তাই মুখের এ-জাতীয় দুর্গন্ধ যাতে দূর না হয়, তাই ইফতারের আগ মুহূর্তে মেসওয়াক করা মাকরূহ। তবে রোজা যদি ফরজ হয়, তবে সূর্য হেলে পড়ার পর হবে মাকরূহ, নফলের ক্ষেত্রে মাকরূহ হবে না। (ইবনে আব্দুল বার, আত-তামহিদ, ১৯/৫৭); আইনি, উমদাতুল কারি

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here