১০ বছরের রাব্বি (ছদ্মনাম) পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। রাব্বি বাসায় থাকলে মায়ের মোবাইল ফোনে গান শোনে, নাটক দেখে। কিন্তু যখন সে নানা বাড়ি বা দাদা বাড়ি বেড়াতে যায় তখন সে অন্য কারও ফোনে ভিডিও গেম ডাউনলোড করে খেলতে থাকে। আর এই খেলার ব্যস্ততায় তারা সারাদিন কেটে যায়।

সম্প্রতি রাব্বির আচরণে নানা পরিবর্তন লক্ষ্য করে তার বাবা-মা। শান্ত রাব্বি এখন একটু কিছুতেই আগ্রাসী হয়ে ওঠে, বইপত্র ছুঁড়ে ফেলে, মায়ের সঙ্গে মুখে মুখে তর্ক করে, পরিবারের সঙ্গে কোথাও যেতে তার অনীহা, এমনকি ছোট দুই ভাই-বোনের গায়েও হাত তোলে সে। আর এসব অভিযোগ নিয়েই রাব্বির বাবা-মা দারস্থ হয়েছেন চিকিৎসকের।  বাবা-মায়ের ধারণা, ভায়োলেন্সপূর্ণ ভিডিও গেম খেলেই লেখাপড়াতে মনোযোগী এবং গান শোনা ও গান গাওয়া শান্ত ছেলেটার এই পরিবর্তন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘বর্তমানে মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেট আসক্তি শিশু-কিশোরদের আচরণকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে। তাদের চিন্তা ও আচরণকে বেপরোয়া করে তুলছে। এ থেকে মুক্তি পেতে হবে। এই বিধ্বংসী পরিস্থিতি থেকে শিশু-কিশোরদের বের করে আনতে হবে। আর না পারলে আগামী প্রজন্ম নিয়ে আমাদের আশা করবার মত কিছু থাকবে না। শিশু-কিশোররা সামাজিক যোগাযোগ এবং সুস্থতার ক্ষেত্রে পিছিয়ে যাচ্ছে। তাই নতুন করে চিন্তার সময় এসেছে। সেটা আইন, সামাজিক উদ্যোগ বা নতুন কোনো কর্মসূচির মাধ্যমেও হতে পারে।’

দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণের পর সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভিডিও গেম আসক্তিকে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে আখ্যা দিয়ে একে রোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তারা নতুন এই রোগের নাম দিয়েছে গেমিং ‘ডিসঅর্ডার।’ আর এ বিষয়টি গেজেট আকারে প্রকাশ হবে ২০২০ সালের শেষে অথবা ২০২১ সালের শুরুর দিকে।

এদিকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘বেশিরভাগ ভিডিও গেমের কনটেন্ট ভায়োলেন্স পূর্ণ। এই কনটেন্টের কারণেই তারা ভায়োলেন্স নিয়ে বড় হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাদের মনন। এমনকি তাদের আচরণেও বিধ্বংসী ভাব চলে আসে।’

কীভাবে এই আসক্তির কথা বোঝা যাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তারা মোবাইলের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা অনুভব করে। তাদের সামাজিকতা কমে যায়, বই পড়ে না, মুভি দেখে না। আর দিনে দিনে ভিডিও গেমে সময় কাটানোর প্রবণতা বাড়তে থাকে এবং খেলতে না পারলে শারীরিক এবং মানসিক বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ’

তবে এ থেকে উত্তরণের জন্য মা বাবার সচেতনাতার দিকে বিশেষভাবে জোর দিয়ে তিনি বলেন, আমরা মোবাইল বা ইন্টারনেট বন্ধ করে প্রজন্ম তৈরি করতে পারব না। সেটা সম্ভবও না। তাই ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘র‌্যাশনাল’ হতে হবে, এবং এটা বাবা-মাকেই নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, সন্তানের হাতে মোবাইল তুলে দিয়ে যখন তারা অন্য কাজ করে তখন একে ‘ডিস্ট্রাকটেড প্যারেন্টিং’ বলা হয়।

ভিডিও গেমস চিন্তা ও আচরণ দুটোই পরিবর্তন আনে। মস্তিষ্কের যে সার্কিটে ইয়াবা ও গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক আসক্তি তৈরি করে ঠিক সেভাবেই ইন্টারনেটও সেখানে আসক্তি তৈরি করে বলে জানান ডা. হেলাল।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here