মেরুদণ্ডহীন প্রাণি মেনে চলে অঙ্কবিদ্যা

প্রাণীটি হলো মৌমাছি। মৌমাছি গণিতে পারদর্শী একটি প্রাণী। মৌমাছি ছোট প্রাণী হলেও তারা বুদ্ধিমান। এক গবেষণায় জানা গিয়েছে, মৌমাছির মগজ ছোট কিন্তু তারা অঙ্ক বুঝতে পারে।

হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের কাছে মৌমাছি ছিল বুদ্ধিমত্তা বিহীন প্রাণী। আমাদের দৃষ্টিতে মৌমাছি এক প্রকার জৈবিক রোবট যারা শুধু প্রকৃতি প্রদত্ত ভূমিকাই পালনেই ব্যস্ত থাকে। এক শতাব্দী আগে অস্ট্রিয়ায় এই ধারনাটি ভুল প্রমানিত হয়।

কিন্তু কে করলো এই কঠিন কাজটি?

আসুন জেনে নেই, কার্ল রিটার ভন ফ্রিশ ছিলেন একজন জার্মান-অস্ট্রিয়ান নীতিবিদ।যিনি ১৯৭৩ সালে নিকোলাস টিনবার্গেন এবং করনাদ লরেঞ্জের সাথে ফিজিওলজি/মেডিসিনে নোবেল পেয়েছিলেন। তাঁর কাজটি ছিলো হানি বি এর সংবেদনশীল ধারনাগুলোর তত্ত্বানুসন্ধানকে কেন্দ্র করে এবং তিনিই প্রথম ওয়েগল নৃত্যের(waggle dance) অর্থ ব্যাখ্যা করেন

শিশুকাল থেকেই কার্ল রিটার ভন ফ্রিশ জানার চেষ্টা করতেন প্রাণীদের কাছে পৃথিবীটা কেমন!
তিনি পরীক্ষা করতেন,পানিতে সাঁতার কেটে বেড়ানো ছোট ছোট মাছগুলো রঙ কিংবা গন্ধ চিনতে পারে কি না! এবং সেগুলো ক্যামেরায় ধারণ করতেন।

হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ মৌমাছিদের অদ্ভুত নৃত্য লক্ষ্য করে এসেছে। কিন্তু কার্ল রিটার ভন ফ্রিশের পূর্বে কেউ ভাবেনি মৌমাছি কি কারনে এরকম অদ্ভুতভাবে ছোটাছুটি করে। ভন ফ্রিশ মৌমাছির প্রতিটি নাচের মুদ্রা নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেন।

তিনি একটি নির্দিষ্ট মৌচাকের একটি মৌমাছিকে চিনি মিশ্রিত পানি পান করতে দেন। মৌমাছিটি প্রথমে খানিকটা চিনি মিশ্রিত পানি পান করে এবং মৌচাকের দিকে রওনা হয়।একই মৌমাছি কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে আসে। ভন ফ্রিশ লক্ষ্য করেন, কয়েক ঘন্টা পর ঐ মৌচাক থেকে দলে দলে মৌমাছি আসতে শুরু করেছে কিন্তু অন্য কোনো মৌচাক থেকে একটি মৌমাছিও আসে নি। তিনি মধুর পরিবর্তে চিনি মিশ্রিত পানি ব্যবহার করেছিলেন তাই মৌমাছিদের গন্ধ অনুভূতি এখানে কাজ করেনি। ভন ফ্রিশ কয়েক কিলোমিটার দূরেও চিনি মিশ্রিত পানি স্থাপন করে একই ফলাফল পান।

কিন্তু কিভাবে অন্য মৌমাছিরা চিনির উৎস খুঁজে পেলো?

প্রথম মৌমাছিটির নৃত্যের মাঝে এক গোপন সংকেত লুকায়িত ছিলো। হাজার বছর শরে মানুষ মৌমাছির এই ছোটাছুটিকে অর্থহীন মনে করলেও এটি এক জটিল বার্তা সংকেত। এটি ছিল গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং সময় জ্ঞানের সমন্বয়ে এক নিখুঁত সমীকরণ।

মৌমাছিরা সূর্যের অবস্থানকে ব্যবহার করে খাদ্যের উৎসের দিক নির্দেশ করে। নৃত্যের দিক সূর্যের দিকে হলে খাদ্যের দিকও সূর্যের দিকে এবং নৃত্যের দিক সূর্যের বিপরীত দিকে হলে খাদ্যের দিকও সূর্যের বিপরীত দিকে। কৌণিক অবস্থানে হলে মৌমাছির নৃত্যের দিকও কৌণিক বরাবরই হয়। মৌমাছির নৃত্যের ব্যাপ্তিকাল খাবারের উৎসের দূরত্ব নির্দেশ করে। আর এই পদ্ধতি পৃথিবীর যেকোনো মহাদেশের যেকোনো সময়ের জন্য সত্য। মানুষ ব্যতীত বুদ্ধিমান প্রাণী চিন্তা করলেই চোখে ভেসে ওঠে এলিয়েনের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু আমাদের পাশেই এক অসাধারণ বুদ্ধিমান প্রাণীর বসবাস যারা কিনা গণিতেও পারদর্শী।

লেখক: নাজিফা জাহান, ডি.ভি.এম(২য় বর্ষ), পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। স্টুডেন্ট জার্নাল-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here