ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬,২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ক্ষমতার ঔদ্ধত্য, আচরণের অবক্ষয় এবং আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়

জনাব আক্তারুজ্জামান সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজর। যতটুকু জানি, তাঁর রাজনৈতিক হাতেখড়ি বিএনপির হাত ধরেই। বিএনপির নির্বাচনী প্রতীক ‘ধানের শীষ’ নিয়ে তিনি একাধিকবার নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন এবং সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছেন। রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই তাঁকে স্পষ্টভাষী ও ‘স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড’ মানুষ হিসেবেই দেখা গেছে। তবে পরবর্তীতে কোনো রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত মতপার্থক্যের কারণে তিনি বিএনপির রাজনীতি থেকে সরে গেছেন, নাকি তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল—তা আমার জানা নেই।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন টকশো ও আলোচনায় বিএনপি, দলটির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে তাঁর বক্তব্য ও মন্তব্য অনেকের কাছেই বিস্ময় ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যে রাজনৈতিক দলের হাত ধরে তাঁর রাজনীতিতে প্রবেশ, যে দলের প্রতীক নিয়ে তিনি নির্বাচন করেছেন এবং যে দলের সমর্থনে সংসদ সদস্য হয়েছেন—পরবর্তীতে সেই দল ও দলের নেতৃত্ব সম্পর্কে তাঁর প্রকাশ্য সমালোচনার ধরন অনেক সময় শালীন রাজনৈতিক মতপার্থক্যের সীমা অতিক্রম করেছে বলেই মনে হয়েছে।

একজন রাজনীতিকের মত পরিবর্তন হতেই পারে। দল পরিবর্তনও গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। কিন্তু মতপার্থক্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও ভাষা, শালীনতা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটা সীমারেখা থাকা প্রয়োজন। কারণ ব্যক্তি চলে যায়, রাজনৈতিক দলও পরিবর্তিত হয়; কিন্তু একজন জনপরিচিত ব্যক্তির বক্তব্যের প্রভাব সমাজে থেকে যায়।

বিভিন্ন সময়ে তাঁর টেলিভিশন টকশোর উপস্থিতি ও বক্তব্য দেখেও প্রশ্ন জেগেছে—জনপরিসরে বিতর্কিত ও অশালীন ভাষার ব্যবহারকে কি আমরা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করে ফেলছি? গণমাধ্যমেরও নিশ্চয়ই একটি দায়িত্ব রয়েছে। ভিন্নমতকে জায়গা দেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি আলোচনার ভাষা ও আচরণ যেন সামাজিক শালীনতার সীমা অতিক্রম না করে, সেটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।

পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নির্বাচনের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁকে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত হতে দেখা গেছে। অথচ অতীতে জামায়াতের বিরুদ্ধে তাঁর কঠোর অবস্থান ও বক্তব্য অনেকেরই মনে থাকার কথা। ফলে তাঁর এই রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। রাজনীতিতে অবস্থান পরিবর্তনের অধিকার প্রত্যেকেরই আছে; কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে অতীতের বক্তব্য ও অবস্থানের সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে—এটাই স্বাভাবিক।

তবে এসব রাজনৈতিক অবস্থানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো একজন নাগরিকের আচরণ এবং আইনের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা।

সাম্প্রতিক সময়ে বিমানবন্দরে একজন কর্তব্যরত ব্যক্তির সঙ্গে আক্তারুজ্জামানের যে আচরণের অভিযোগ সামনে এসেছে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা, সাবেক সংসদ সদস্য কিংবা জনপরিচিত ব্যক্তি—পরিচয় যাই হোক না কেন, দায়িত্ব পালনরত কোনো সরকারি বা কর্তব্যরত ব্যক্তির সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে শালীনতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা অপরিহার্য।

প্রশ্নটা তাই শুধু আক্তারুজ্জামানকে নিয়ে নয়; প্রশ্নটা আমাদের সামগ্রিক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি নিয়ে।

কেউ কি তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়, অতীত পদ-পদবি কিংবা সামাজিক প্রভাবের কারণে আইনের ঊর্ধ্বে? যদি কেউ এমন ধারণা পোষণ করেন, তাহলে সেটি শুধু ব্যক্তির ঔদ্ধত্য নয়—রাষ্ট্রের আইনের শাসনের জন্যও একটি বিপজ্জনক বার্তা।

সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে—অভিযোগ যার বিরুদ্ধেই উঠুক, তার রাজনৈতিক পরিচয় বা অবস্থান বিবেচনা না করে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। তিনি আক্তারুজ্জামান হোন, কিংবা সরকারি দলের কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি—আইনের প্রয়োগে সবার জন্য একই মানদণ্ড থাকা উচিত।

আক্তারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক ঘটনায় গ্রেপ্তারের খবর সামনে এসেছে। অভিযোগের বিচার আদালত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। তবে এই ঘটনাকে শুধু একজন ব্যক্তির গ্রেপ্তার হিসেবে দেখলে বিষয়টির বৃহত্তর তাৎপর্যটি হয়তো অনুধাবন করা হবে না। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হওয়া উচিত—রাষ্ট্রে কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

ক্ষমতা, পরিচয়, পদ-পদবি কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব কোনো মানুষকে আইনের ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে পারে না। একজন সাধারণ নাগরিকের জন্য যে আইন প্রযোজ্য, একজন সাবেক সংসদ সদস্য বা প্রভাবশালী ব্যক্তির ক্ষেত্রেও সেই আইনই প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

কারণ আইনের শাসনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—আইন ব্যক্তি দেখে চলে না, অপরাধ ও অভিযোগের ভিত্তিতে চলে।

আজ আক্তারুজ্জামান, কাল অন্য কেউ। ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠিত হওয়া দরকার নীতিটি—কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

লেখক: মো. কাওছার আলম চৌধুরী, কবি, লেখক ও স্বাধীন সাংবাদিক