২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গত দেড় দশকে বাংলাদেশে তথাকথিত ‘জাতীয়তাবাদ’ ও ‘চেতনার’ আড়ালে যে বড় বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তার অন্যতম একটি ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (USA) উন্নত মানের কৃষিপণ্য আমদানিতে চরম অনাগ্রহ। জনগণের সামনে মুখে ফেনা তুলে প্রচার করা হতো—আমেরিকার পণ্যের দাম বেশি কিংবা তাদের শর্তাবলী আমাদের সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। কিন্তু দেড় দশকের গম আমদানির প্রকৃত খতিয়ান ও গাণিতিক হিসাব বিশ্লেষণ করলে এক চরম সত্য বেরিয়ে আসে। মার্কিন পণ্য বর্জনের এই কথিত চেতনা কোনো দেশপ্রেম বা ভূ-রাজনীতি ছিল না; বরং তা ছিল শেখ হাসিনা ও তার তোষামোদকারী গংদের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং বিদেশে পাচারের এক সুপরিকল্পিত ভণ্ডামি।
‘চেতনার’ আড়ালে পশুখাদ্য আমদানির মহোৎসব
খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) তথ্য অনুযায়ী, বিগত ১৫ বছরে দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে সর্বমোট প্রায় ৭ কোটি টন (৭০ মিলিয়ন মেট্রিক টন) গম আমদানি করা হয়েছে। এর সিংহভাগই আনা হয়েছে রাশিয়া, ইউক্রেন ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলো থেকে।
আন্তর্জাতিক কমোডিটি মার্কেটের নিয়ম অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে মানুষের খাওয়ার উপযোগী উন্নত মানের গম যখন টন প্রতি ২৫০ থেকে ২৮০ ডলারে বিক্রি হতো, তখন প্রোটিনহীন, পোকাযুক্ত ও ভাঙা পশুখাদ্য বা ‘ফিড হুইট’ (Feed Wheat)-এর দাম ছিল মাত্র ১০০ থেকে ১২০ ডলার। হাসিনা গংদের মূল ভণ্ডামি ছিল এখানেই। তারা ক্ষমতার জোরে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে মাত্র ১০০-১২০ ডলারের সস্তা পশুখাদ্য কিনত। কিন্তু সরকারি নথিপত্রে ও এলসিতে (LC) সেটিকে উচ্চমানের মানুষের খাদ্য দেখিয়ে কোষাগার থেকে টন প্রতি ২৮০ ডলার তুলে নেওয়া হতো। অর্থাৎ, প্রতি টন গম আমদানিতেই স্রেফ কাগজের জালিয়াতিতে গড়ে প্রায় ১৫০ মার্কিন ডলার সরাসরি পকেটে ভরা হতো।
২০১৫ ও ২০২৩ সালের কেলেঙ্কারি: লুণ্ঠনের অকাট্য প্রমাণ
এই দেড় দশকে জনমতের তোয়াক্কা না করে কীভাবে নিম্নমানের খাদ্য এনে অর্থ লোপাট করা হয়েছে, তার দুটি সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:
২০১৫ সালের ব্রাজিলীয় ‘পচা গম কেলেঙ্কারি’: এই বছর শেখ হাসিনা সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয় ওএমএস এবং দরিদ্রদের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির জন্য ব্রাজিল থেকে প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার টন গম আমদানি করে। সরকারি গবেষণাগার (BCSIR) ও ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় স্পষ্ট প্রমাণিত হয়েছিল যে, এই গম সম্পূর্ণ খাওয়ার অযোগ্য, পোকাযুক্ত ও নিম্নমানের পশুখাদ্য। দেশের ডিলার ও মিল মালিকরা তা নিতে অস্বীকৃতি জানালে হাইকোর্ট পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করে। তৎকালীন প্রায় ৪০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পে পশুখাদ্যকে মানুষের খাদ্য দেখিয়ে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কোটি টাকা জালিয়াতি ও আত্মসাৎ করেছিল হাসিনা গংরা।
২০২৩-২৪ সালের রাশিয়ান গম কেলেঙ্কারি: সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের প্রত্যক্ষ দায়িত্বে ২০২৩ ও ২০২৪ অর্থবছরে রাশিয়া থেকে প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১ লাখ টন গম আমদানি করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তখন রাশিয়ার এই নিম্নমানের গমের প্রকৃত দাম ছিল প্রতি টন ২০২ মার্কিন ডলার। কিন্তু হাসিনা গংরা নথিপত্র জালিয়াতি করে তা সরকারি কোষাগার থেকে প্রতি টন ২৮০ ডলার (টনে প্রায় ৮০ ডলার বেশি) দরে কেনে। এই একটি মাত্র রাষ্ট্রেীয় চুক্তি থেকেই ওভার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা সরাসরি বিদেশে পাচার করা হয়েছিল।
১৫ বছরের চুরির গাণিতিক খতিয়ান
এই বাস্তবসম্মত গাণিতিক সূত্রটি যদি গত ১৫ বছরে আমদানিকৃত মোট ৭ কোটি টন গমের ওপর প্রয়োগ করা হয়, তবে এই ভণ্ড চক্রের আসল চেহারা উন্মোচিত হয়:
১৫ বছরের মোট আমদানি: প্রায় ৭,০০,০০,০০০ টন। প্রতি টনে আত্মসাৎ: ১৫০ মার্কিন ডলার। মোট লুণ্ঠিত অর্থ: ৭,০০,০০,০০০ × ১৫০ = ১,০৫০,০০,০০,০০০ মার্কিন ডলার (১০.৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৫০ কোটি ডলার)
বর্তমান মুদ্রা বাজার অনুযায়ী, বাংলাদেশি টাকায় এই চুরির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা। দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে শুধু গমের বাজার থেকেই এই বিশাল অঙ্কের টাকা জনগণের পকেট কেটে উধাও করা হয়েছে।
আসল টার্গেট ছিল ‘ওভার-ইনভয়েসিং’ ও অর্থ পাচার
এই মহাচুরির ভেতরের ছকটি ছিল আরও নিখুঁত। দেশের মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া এই আমদানির লক্ষ্য ছিল না। আসল টার্গেট ছিল ‘ওভার-ইনভয়েসিং’ (কাগজপত্রে পণ্যের কৃত্রিম চড়া দাম দেখানো) এবং এর মাধ্যমে দেশের ডলারের রিজার্ভ ফাঁকা করে বিদেশে টাকা পাচার করা।
যেহেতু খাদ্যশস্য আমদানির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এলসি খোলার ক্ষেত্রে ডলারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হতো, তাই হাসিনা গংরা এই খাতটিকে টাকা পাচারের সবচেয়ে নিরাপদ রুট বানায়। তারা দুবাই, সিঙ্গাপুর বা কানাডায় নিজেদের বেনামী বা ‘শেল কোম্পানি’ খুলে রাখত। বাংলাদেশ সরকার যখন ২৮০ ডলারে গম কেনার এলসি খুলত, তখন সেই টাকা সরাসরি চলে যেত দুবাই বা সিঙ্গাপুরের ওই ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। সেখান থেকে প্রকৃত গম সরবরাহকারীকে মাত্র ১০০ ডলার পরিশোধ করে সস্তা পশুখাদ্য জাহাজে তুলে দেওয়া হতো। বাকি ১৮০ ডলার আর কোনোদিন বাংলাদেশে ফেরত আসত না। সেটি সরাসরি তাদের বিদেশী ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়ে ওয়াশিংটন, বেগম পাড়া বা মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোমে পাচার হয়ে যেত।
কেন মার্কিন পণ্যের কড়াকড়িতে হাসিনা গংদের এত ‘অ্যালার্জি’?
ঠিক এই জায়গাতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর আইনি ব্যবস্থা এই ভণ্ড চক্রের জন্য যমদূত হিসেবে কাজ করেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফরেন কোরাপ্ট প্র্যাকটিসেস অ্যাক্ট’ (FCPA) এবং সে দেশের কৃষি বিভাগের (USDA) নিয়ম অনুযায়ী, কোনো মার্কিন কোম্পানি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কোনো ধরনের আন্ডার-টেবিল কমিশন বা ওভার-ইনভয়েসিংয়ের আশ্রয় নিতে পারে না।
আমেরিকা থেকে গম কিনতে গেলে শতভাগ স্বচ্ছ ডিক্লারেশন দিতে হতো। ১০০ ডলারের পশুখাদ্যকে কোনোভাবেই ২৮০ ডলারের মানুষের খাদ্য বলে জিপিএস ট্র্যাকিং বা আন্তর্জাতিক অডিটে পার পাওয়া সম্ভব ছিল না। জালিয়াতি করলেই মার্কিন ফেডারেল এজেন্সির তদন্ত এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হওয়ার শতভাগ ঝুঁকি ছিল।
যেহেতু মার্কিন পণ্য কিনলে এক ডলারও চুরি করা সম্ভব নয় এবং বিদেশে টাকা পাচারের কোনো গোপন পথ বের করা যায় না, তাই দেড় দশক ধরে এই চেতনা ব্যবসায়ী গংরা কৌশলে জনগণকে বুঝিয়েছে যে, ‘আমেরিকা আমাদের বন্ধু নয়’ বা ‘আমেরিকার পণ্যের দাম বেশি’। অথচ বাস্তবে, আমেরিকার কৃষিপণ্য আমদানি করলে দেশের মানুষের পাতে যেমন উন্নত পুষ্টি আসত, তেমনি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হওয়া থেকে বেঁচে যেত।
মুখোশ উন্মোচন: চেতনা বনাম মেগা লুটপাট
বিগত দেড় দশকের এই খাদ্য কেলেঙ্কারি প্রমাণ করে যে, এটি কোনো রাজনৈতিক আদর্শ বা ভূ-রাজনৈতিক কৌশল ছিল না। এটি ছিল ‘দেশপ্রেম’ ও ‘চেতনার’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে পরিকল্পিতভাবে দেশীয় সম্পদ লুণ্ঠন ও অর্থ পাচারের এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। সস্তা পশুখাদ্যের চড়া দাম দিয়ে দেশের সাধারণ মানুষকে কেবল পুষ্টিহীনতার দিকেই ঠেলে দেওয়া হয়নি, বরং প্রতিটি নাগরিকের ট্যাক্সের টাকাকে ডলারে রূপান্তর করে পাচার করা হয়েছে বিদেশের মাটিতে। আজ সময় এসেছে এই ভণ্ডামির মুখোশ পুরোপুরি উন্মোচন করার।
লেখক, মো: জামাল হোসেন
কলামিস্ট ও চিন্তক।








