ঢাকা | মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫,১ পৌষ ১৪৩২

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ: কার লাভ, কার ক্ষতি

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গত বছর অগাস্টে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সব সংগঠনের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। অনেকেই ধারণা করেছিলেন আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা পরে দলটি বিলুপ্ত হবে ও শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হবে বা থাকবে না।

কিন্তু বিশ্লেষণ করলে দেখায যায়, এই নিষেধাজ্ঞা বরং শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ করেছে! এতে হাসিনা ভেতরে ভেতরে অনেকটা খুশিই হয়েছেন ও স্বস্তিতে আছে। কারণ বিতারিত শেখ হাসিনা ভালো করেই জানেন তিনি অতি সহসায় আর বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন না। তাকে তার অপকর্মের জন্য বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। সুতরাং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ না হলে এর নেতৃত্ব তার থেকে হাত ছাড়া হওয়ার ভয় ছিল। আর এবার অন্য কেউ আওয়ামী লীগ রিফর্ম করলে বা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব তার হাত ছাড়া হলে তা আর ফেরত পাবেন না বলে তিনি অনেকটা দুশ্চিন্তায় ও হতাশায় ভুগছিলেন। কারন এই দলকে তিনি নিজের পৈত্তিক সম্পত্তি মনে করেন!

আওয়ামী লীগের মধ্যে একটা গ্রুপ আছে যারা শেখ হাসিনা ও শেখ পরিবারের বাহিরে নেতৃত্ব চান। হাসিনার নেতৃত্বে তার আর চলতে চান না। কারন তিনি নিজ দলের নেতৃত্বে, সিদ্ধান্ত গ্রহণেও স্বৈরাচার ছিলেন। তারা আওয়ামী লীগের মধ্যে সংস্কার চান। শেখ হাসিনা ও শেখ পরিবারের অপকর্মের দায়ভার তারা কোনোভাবে নিতে চায় না।

লীগ নিষিদ্ধ থাকায় দলের কাউন্সিল সম্ভব নয়, ফলে শেখ হাসিনাকে অভ্যন্তরীণভাবে চ্যালেঞ্জ করার পথ বন্ধ। দলের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ বন্ধ থাকায় শেখ হাসিনার নেতৃত্ব অনেকটা নিরাপদ।

সরকারের ভেতরে আওয়ামী লীগের তথা হাসিনার কিছু বিশেষ এজেন্ট বা প্রভাবশালী কর্মকর্তা সক্রিয় রয়েছে। যারা বিশেষ পরিস্থিতির সুযোগে বিভ্রান্তিকরভাবে দলের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে। এর উদ্দেশ্য ছিল হাসিনার রাজনৈতিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতকে কৌশলগতভাবে রক্ষা করা।

হাসিনার বিশেষ এজেন্টরা এই পরিস্থিতি ভুল বুঝিয়ে এভাবে লীগের ওপর প্রজ্ঞাপণের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে যাতে শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ রাজনীতির পথ নিরাপদ থাকে। অথচো নিষেধাজ্ঞা বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে আদালতের মাধ্যমে কার্যকর হলে তা হতো আইনসম্মত ও সঠিক সিদ্ধান্ত।

হাসিনা এখন বিদেশীদের সহানুভূতি পেতে চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তিনি নিজেকে ‘নিপীড়িত’ ভাবমূর্তি তৈরির অপচেষ্ট করছে। লীগের নিষেধাজ্ঞা ও নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার কারণে শেখ হাসিনা নিজেকে আন্তর্জাতিকভাবে নির্যাতিত ও গণ অভ্যুত্থাণকে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরতে অপচেষ্টা করছে। এ বিষয়ে হাসিনা আন্তর্জাতিকভাবে বিশেষ লোবিষ্ট নিয়োগ দিয়েছে ও ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ কাজ করছে।

শেখ হাসিনা ও তার নেতারা ভারতে পালিয়ে যাওয়ায় ও লীগ নিষিদ্ধ হওয়ায় এমনিতেই দলীয় কার্যক্রম স্থবির হয়ে পরেছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ বা বিদেশে বসে তিনি কাউকে আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী করতে পারবেন না। তাই বিদেশে বসে নমিনেশন বোর্ড গঠন করে কাউকে নির্বাচনে মনোনয়নও দিতে পারবে না। কার্যত আওয়মী লীগ নির্বাচনেও অংশ নিতে পারবে না এটা প্রায় নিশ্চিত। অর্থাৎ দলের ক্ষতি হলেও শেখ হাসিনা রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছেন।

আওয়ামী লীগের মধ্যে যারা সংস্কার চান তারা মনে করেন শেখ হাসিনা ও দলীয় কিছু নেতার কোনো অপকর্মের দায় দলের নিরাপরাধ নেতা কর্মীরা নিবে না। তাদের জন্য যারা নিরাপরাধ নেতা-কর্মী তাদের দায় দেওয়াও ন্যায়সঙ্গত নয়।

যেহেতু শেখ হাসিনা বা তাঁর সহযোগীরা অপরাধে জড়িত ছিলেন, তাই শুধুমাত্র তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা উচিত।

সুতরাং আ. লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলেও শেখ হাসিনার রাজনৈতিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি ভারতে থাকায় অনেকটা মুক্ত ও নিরাপদে আছেন। দলের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখে তাকে পরতে হচ্ছে না এবং আন্তর্জাতিকভাবে নিজেকে “নিপীড়িত নেতা” হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্ট করছেন। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের ক্ষতি হলেও শেখ হাসিনা রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছেন।

লেখক: মনি, সাংবাদিক ও লেখক।