ভালবাসা দিবস: পুঁজিবাদের ভয়াল থাবা

একটা পরিসংখ্যানের দিকে লক্ষ করুন, পৃথিবীর ৯৯ ভাগ সম্পত্তি ১ ভাগ মানুষের হাতে আছে বাকি ১ ভাগ সম্পত্তি ৯৯ ভাগ মানুষের কাছে আছে। এটা কিভাবে সম্ভব আর ভালবাসা দিবসের সাথে এর সম্পর্ক কোথায়? এটা কিভাবে সম্ভব তা আরেক আলোচনা। কিন্তু ভালবাসা দিবস, অবশ্য শুধু ভালবাসা দিবস না, অধিকাংশ দিবস এবং উৎসব ঐ ১ শতাংশ মানুষের প্রয়োজনেই বজায় আছে এবং নিত্য নতুন ভাবে আমাদের সামনে উপস্থাপিত হচ্ছে এবং আমরাও তাদের সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলতে আমাদের শ্রম্, মেধা এবং সর্বোপরি নিজেদের বিলিয়ে দিচ্ছি। কেন এমনটা হয়?

প্রতিটি সমাজ কাঠামোকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। ভিত্তি কাঠামো ও উপরি কাঠামো। ভিত্তি কাঠামো হচ্ছে অর্থনীতি, আর উপরি কাঠামোতে থাকে আদর্শ, নিয়ম-নীতি, সংগঠন, প্রথা ইত্যাদি। এই দুইটি কাঠামোর একে অপরের উপর প্রভাব রাখে। একটির পরিবর্তনে অপরটির পরিবর্তন সাধিত হয়। বিবর্তনের ধারায় পৃথিবী এমন একটি অবস্থানে এসে পৌছেছে যে পুরো পৃথিবী সংযুক্ত হয়ে পড়েছে এবং পৃথিবী শাসন করছে তারা যারা এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক। এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকেই বলি পুঁজিবাদ এবং পুঁজিবাদ টিকিয়ে রাখা হয়ে হয়েছে তাদের ক্ষমতার জন্য ও ক্ষমতা টিকে আছে পুঁজিবাদের জন্য। পুঁজিবাদী অর্থনীতি টিকিয়ে রাখছে আন্তর্জাতিক বড় বড় কিছু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, জোট, গোষ্ঠী এবং তাদের তাবেদার ও সহায়ক হিসেবে বিরাজ করছে আঞ্চলিক ব্যবসায়িক গোষ্ঠী এবং সরকারগুলো। এরা সবাই একে অপরের পরিপূরক!

পুঁজিপতিদের আন্তর্জাতিক বাজার দখল রাখতে হয়। নিত্য নতুন পণ্য বাজারে না আনতে পারলে ব্যবসা টিকবে না এটা সমঝদার যেকোনো মানুষই বুঝবে, এটা কোন রকেট সাইন্স না। তো নতুন পণ্যের চাহিদা না থাকলে মানুষ পণ্য কিনবে কেন? আগেই বলেছি, উপরি কাঠামো (আদর্শ, মূল্যবোধ, এর সাথে যুক্ত করুন বিভিন্ন ট্রেন্ড, যার অন্যতম ভিত্তি আবেগ) তে কোনো প্রভাব পড়লে অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়ে। সহজ হিসাব, পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি করতে হবে এবং এজন্য যা করা দরকার করতে হবে। তো তারা কি কি করে? তারা সেলিব্রেটিদের ব্যবহার করে, মিডিয়া ব্যবহার করে, তারা নিজস্ব বুদ্ধিজীবীদের ব্যবহার করে। কিভাবে ব্যবহার করে তা একটু পরে আলোচনা করছি। ভালবাসা দিবস নিয়ে কিছু তথ্য উপস্থাপন করি।

ভালবাসা দিবসকে পুঁজিবাদের ভয়াল থাবা বলেছি তাহলে পুঁজিবাদের সম্পর্ক কোথায় এখানে? এই দিবস উৎযাপন ঘিরে প্রচুর পরিমাণ উপহার সামগ্রী বেচা-কেনা হয়। এই উপহার সামগ্রীর অন্তর্ভুক্ত প্রায় সবই আমরা বিলাস দ্রব্য হিসেবেই জানি। এছাড়া একটি বড় লেনদেন সম্পন্ন হয় ডিজিটাল লেনদেন হিসেবে। এছাড়াও সিনেমাসহ বিভিন্ন ইভেন্ট তো আছেই। ২০২০ সালে বাংলাদেশে এই বেচা-কেনার পরিমাণ ছিল এক হাজার কোটি টাকা যার মধ্যে দুইশ কোটি টাকা ছিল ফুল (সূত্রঃ কালের কন্ঠ, ১৪ ফেব্রুয়ারি,২০২০)। আমেরিকায় এ ব্যবসা ছিল ২৭.৪ বিলিয়ন ডলার বা ২৩ হাজার ২৩১ কোটি টাকার বেশি। এই টাকার প্রায় পুরোটা গিয়েছে ঐ ১ ভাগ মানুষের পকেটে যাদের হাতে পৃথিবীর মোট সম্পত্তির ৯৯ ভাগ জিম্মি। তাহলে ভাবুন, ভালবাসা দিবস কার স্বার্থে? ভালবাসার নাকি পুঁজিবাদের? এখানেই শেষ না, থাবার পুরো অংশ এখনও দেখা হয় নি।

সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর অনেক পুরাতন ও বহুল ব্যবহৃত একটি অস্ত্র হচ্ছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। যেসব দেশেই তারা সাম্রাজ্য স্থাপন করেছে তাদেরকে “সভ্যকরন” প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছে এবং ইউরোপীয়দের নিজস্ব সংস্কৃতি নানাভাবে সেখানে প্রবেশ করানো হয়েছে। ধুলায় মিশিয়ে দেয়া হয়েছে কলোনিগুলোর নিজস্ব সংস্কৃতি। ভারত কিংবা আফ্রিকা যেখানেই তারা গিয়েছে, একই কাজ করেছে। এটা অতীতের ঘটনা। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন অধিকাংশ রাষ্ট্র স্বাধীন হয়ে যায়, সাম্রাজ্যবাদীরা নতুন নতুন পন্থা অবলম্বন করে এসব অঞ্চলে প্রভাব বজায় রাখতে। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এসবই এই নব্য-সাম্রাজ্যবাদের হাতিয়ার।

এই সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী আর পুঁজিবাদী গোষ্ঠী কখনোই আলাদা ছিল না। তারা এক এবং অদ্বিতীয়। পণ্যের বাজার প্রতিষ্ঠা ও ধরে রাখাই তাদের উদ্দেশ্য। তারা যুদ্ধ তৈরি করে, যাতে অস্ত্র বিক্রি করতে পারে, তারা সিনেমা তৈরি করে যাতে সেলিব্রেটিদের দৃশ্যায়িত পণ্য বিক্রি করতে পারে, তারা নাটক, সিনেমা, ক্রিকেট ফুটবলের মাধ্যমে নতুন নতুন Craze (উম্মাদনা/বাতিক/প্রবল আকর্ষনের বস্তু) তৈরি করে। আমরা যখন দেখি মানুষ আইফোনের জন্য কিডনি বেঁচে দিচ্ছে, প্রেমিকাকে গিফট দেয়ার জন্য ডাকাতি করছে, নিজের বাবা-মা কে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা নিয়ে বন্ধুদের সাথে পার্টি দিচ্ছে তখন আমরা এর ব্যাখ্যা খুঁজি। এর ব্যাখ্যা দেয় মনোবিজ্ঞানীরা, সমাজবিজ্ঞানীরা। কিন্তু কেউই বলে না, এই মনঃবিকৃতি, এই উন্মাদনা ঐ গোষ্ঠীর তৈরি যারা আইফোন তৈরি করে, যারা দামী গিফট ও পার্টির ট্রেন্ড চালু করেছে। পদ্মাবতী সিনেমায় দিপীকার একটি পোশাকের দাম ছিল এক কোটি টাকা। এক কোটি টাকার পোশাক ব্যবহার না করলে পদ্মাবতী সিনেমা চলতো না? চলতো। তাহলে? যেহেতু সেলিব্রেটিরা মানুষের ভগবানের জায়গা নিয়ে নিয়েছে তাই তাদের অনুসরণ হবে এটা পরিচালক ও পোশাক নির্মাতা জানে, আর সেইসব মানুষ এক কোটি না, দুই তিন কোটি দিয়েও অইরকম একটি পোশাক কিনবে কারণ পোশাকটি দীপিকা পড়েছে এবং পোশাকটির বাজারমূল্য অনেক বেশি হওয়ায় নিজ শ্রেণীতে তার মূল্যও বৃদ্ধি পাবে। ঠিক একই ভাবে দেখবেন, মানুষের দামী মোবাইল, দামী বাইক সহ নতুন এবং দামী পণ্যের প্রতি আকর্ষণ তৈরি করা হচ্ছে, যদিও ঐ পণ্যের প্রয়োজন হয়তো ঐ ব্যক্তির আদৌ ই নাই। এই আকর্ষণ উন্মাদনায় পরিণত হচ্ছে, ট্রেন্ড হয়ে যাচ্ছে। ভালবাসা দিবস এই উন্মাদনা, ট্রেন্ড ব্যাতীত আর কিছুই না আর এর কারণ লুকিয়ে আছে ঐ এক হাজার কোটি টাকার মধ্যে। যেহেতু তাদের টাকা চাই এবং এই টাকা দিবে আপামর জনগণ, সুতরাং জনগণকে কোনভাবেই বুঝানো যাবে না তুমি গরীব। যদি তোমার বাসায় তিন বেলা খাবার নাও থাকে, তুমি একটি রঙিন টিভি কিনবে এবং তা ধার করে হলেও। যেহেতু টাকাকে সমাজের উঁচু নীচুর মানদন্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে, তাই অধিকাংশ মানুষই চাইবে না নিজের সঙ্গীর কাছে নিজেকে টাকা-হীন হিসেবে প্রকাশ করতে। টাকার উৎস যাই হোক, “সম্মান” বজায় রাখা চাই।

সিনেমায় যখন প্রিয় নায়ক নায়িকাদের উন্মাদনা দেখে, টিনএজাররা যে নিজেদের আবেগ ধরে রাখতে পারবে না এটা অস্বাভাবিক কিছু না। তবে, বাবা-মায়েরা যেখানে পুঁজিবাদের কালো ধাবায় চুমো খায় সকাল বিকাল দুই বেলা, ছেলে মেয়েরা যে তা করবে না তা ভাবা অন্যায়।

কার্ল মার্ক্সের একটি বক্তব্য দিয়ে শেষ করি, “পুঁজিবাদ ভেল্কিবাজির দ্বারা উৎপাদন এবং বিনিময়ে এমন এক বিশাল পদ্ধতি তৈরি করেছে যেন এক জাদুকর জাদু দিয়ে প্রেতলোক থেকে অশুভ শক্তিকে নিয়ে আসার পর সেই শক্তিকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না”।

রেফারেন্সঃ (১) পুঁজিবাদ এক ভৌতিক কাহিনী (অরুন্ধতি রায়, অনুবাদঃ মুর্তালা রামাত ও শারমিন শিমুল)
(২) Social Structure : Nico Wilterdink

লেখকঃ ফাইজার মো শাওলীন
শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here