বিশ্ব বই দিবস: ভালো বই, পড়বই

এক সোরাহি সুরা দিও, একটু রুটির ছিলকে আর,
প্রিয় সাকি, তাহার সাথে এক খানা বই কবিতার…

বিখ্যাত ইরানি কবি ওমর খৈয়াম তার রুবাইয়ে এভাবেই বইয়ের জন্য আর্তি জানিয়ে গেছেন। আর এই আর্তি শুধু তার নয়, প্রত্যেকটি বইপ্রেমী মানুষের মনের কথা যেন এটাই। মহানবী( সাঃ)-এর একটি হাদিসকে কাব্যরূপ দিতে গিয়ে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছিলেন, ” জোটে যদি মোটে একটি পয়সা /খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি/ দুটো যদি জোটে অর্ধেক তার/ফুল কিনিও হে অনুরাগী।”

বইপ্রেমীদের জন্য একটা ভালো বই হলো সেই ফুল যেটা কিনা কোনো মানুষের মনোজগতে, তার রুচিতে, তার বোধে আমূল পরিবর্তন আনতে সক্ষম। কেউ জানেনা কখন, কিন্তু সবার জীবনেই একটা না একটা বই আসে যা কিনা জীবনের কোনো না কোনো সময় একজন মানুষের চিন্তাভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলে।

অনেকে বই বলতে শুধু সাহিত্য বোঝেন, অনেকে বই বলতে শুধু পাঠ্যবই বোঝেন। কোন ধরনের বই পড়ছেন তা খুব বেশি পার্থক্য না আনলেও ভালো বই বেছে নেয়া পাঠকের পক্ষে খুবই জরুরি। দার্শনিক রেনে দেকার্তের মতে, “ভালো বই পড়া মানে গত শতাব্দীর সেরা মানুষদের সঙ্গে কথা বলা।” শুধু তাই নয়, ভালো বই আপনাকে বিশ্বভ্রমণের অভিজ্ঞতা দিতে পারবে, কালের পরিক্রমা অতিক্রম করে ইতিহাসের কোণায় কোণায় লুকিয়ে থাকা রহস্যের খোঁজ দিতে পারবে, সর্বোপরি যেই জিনিসটা আমরা পাই সেটা হচ্ছে আত্মার পরিতৃপ্তি। বই কিনে মানুষ দেউলিয়া হয়না, কিন্তু বই না পড়লে অন্তরাত্মা দেউলিয়া হয়ে যায় ঠিকই।

আজ ২৩ এপ্রিল, বিশ্ব বই দিবস। ১৯৯৫ সালে ইউনেস্কোর উদ্যোগে প্রথমবারের মত এই দিনটিকে বিশ্ব বই দিবস হিসেবে পালন করা শুরু হয়। এরপর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিবছর এইদিনে বিশ্ব বই দিবস পালিত হয়ে আসছে। দিবসের মূল ধারণাটি আসে ভ্যালেন্সীয় লেখক ভিসেন্ত ক্লাভেল আন্দ্রেসের কাছ থেকে। তিনি তার প্রিয় লেখক মিগুয়েল দে সার্ভান্তেসকে সম্মান জানানোর একটি উপায় হিসাবে বই দিবসের ধারণাটি দেন। ১৯২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাজা আলফনসো ত্রয়োদশ স্পেন জুড়ে স্পেনীয় বই দিবস পালনের জন্য একটি রাজকীয় ফরমান জারি করেন। পরে সমগ্র স্পেনে দিবসটি পালন করা শুরু হয়। প্রথমে ৭ অক্টোবর সার্ভান্তেসের জন্মদিনে দিবসটি পালন শুরু হয়, পরে তা তার মৃত্যুদিন ২৩ এপ্রিলে স্থানান্তর করা হয়। ১৬১৬ সালের একই দিনে ডন কিহোতের লেখক মিগুয়েল দে সার্ভান্তেস এবং বিখ্যাত ইংরেজ লেখক উইলিয়াম শেকসপিয়ার– উভয়ের মৃত্যুদিন হওয়ায় বিশ্ব বই দিবস হিসেবে এই দিনটিকেই বেছে নেয়া হয়। এছাড়াও দিনটি সত্যজিৎ রায়, হালদোর লাক্সনেস, উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থসহ আরও অনেক বিখ্যাত মানুষের জন্ম ও মৃত্যুদিন। এবারের বই দিবসের প্রতিপাদ্য, “শেয়ার এ স্টোরি।”

বর্তমান যুগ প্রযুক্তিনির্ভর হলেও বইয়ের আবেদন কমেনি একটুও। কিন্তু যেভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়ে চলেছে সেভাবে চলতে থাকলে বই আর কতদিন তার জায়গা ধরে রাখতে পারবে বলা মুশকিল। আজকাল শিশুদের হাতে প্রতিনিয়ত আমরা লক্ষ্য করছি বিভিন্ন ধরনের স্মার্টফোন কিংবা গেমিং ডিভাইস। আমরা যদি আমাদের শিশুদের হাতে এসবের জায়গায় কিছু ভালো বই তুলে দেই, তাহলে তা যেমন তার সুশিক্ষার জন্য উপকারী হবে, তেমনই সহায়ক হবে তাদের কল্পনাশক্তি এবং মেধাকে উসকে দিয়ে তাদের সৃজনশীলতার বহুমাত্রিক বিকাশের ক্ষেত্রে। শুরুটা হতে পারে ঈশপের গল্প, সুকুমার রায়ের গল্প কবিতা, নাসিরুদ্দিন হোজ্জা কিংবা গোপাল ভাঁড় দিয়ে। একটু বড় হতে হতেই তাদের হাতে দেয়া যায় ডন কিহোতে, রবীন্দ্রনাথের কিশোর ছোটগল্প, মুক্তিযুদ্ধের গল্প কিংবা তলস্তয়ের কিশোর ছোটগল্পের মত বই। তারপর আস্তে আস্তে ওরা নিজেরাই নিজেদের জন্য ভালো বই বেছে নিতে পারবে। কিন্তু ওদের পথ চিনিয়ে দিতে হবে আমাদেরই। দেশীয় বইয়ের পাশাপাশি ভালো অনুবাদ বই ওদের পরিচয় করিয়ে দেবে বিশ্বসংস্কৃতির সাথে। উন্নত দেশগুলোতে বই দিবসে শিশুরা তাদের পছন্দের বইয়ের পছন্দসই চরিত্রের মত করে সাজে। আমাদের দেশেও স্কুলপর্যায়ে এভাবে আয়োজন করে শিশুদের বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে তোলা যায়।

বই আমাদের মনোযোগ যেভাবে নিবদ্ধ রাখে, তেমনটা আর কেউ নয়। যারা বই পড়েনা, তাদের চেয়ে অভাগা হয়ত আর কেউ নেই। তারা বঞ্চিত হয় পৃথিবীর সবচেয়ে উদযাপিত আনন্দ থেকে। একটা ভালো বই পাঠককে নিজের মধ্যে ধরে রাখে, আর একজন ভালো পাঠক সেই যে কিনা একটা ভালো বই বেছে নিতে পারে। ভালো বই হচ্ছে স্বপ্নের মতো, পাঠককে অন্য এক জগতে নিয়ে যায়। বিখ্যাত লেখক ঝুম্পা লাহিড়ীর মতে, “বইয়ের সবচেয়ে ভালো দিক হলো এটা তোমাকে পা না নাড়িয়েই ভ্রমণ করতে দেয়।”

সিসেরোর মতে, “বইবিহীন ঘর আত্মাবিহীন শরীরের মত।”

হোর্হে লুই বোর্হেস বলেন, “আমি সবসময় চিন্তা করেছি যে হয়ত বেহেশত হবে কোনো এক ধরনের লাইব্রেরি।”

আর্নেস্ট হেমিংওয়ের মতে, “বইয়ের চেয়ে বিশ্বস্ত আর কোনো বন্ধু নেই।”

তলস্তয়ের মতে, “জীবনে শুধু তিনটি জিনিস প্রয়োজন — বই, বই এবং বই।”

বই পড়লে উদ্বেগ কমে, সৃষ্টিশীলতা, ধৈর্য ও জ্ঞান বৃদ্ধি পায়। প্রতিদিনের পাঠাভ্যাসে কাজে উদ্যম ফিরে আসে। একটা ভালো বইয়ের চেয়ে বড় বন্ধু আর কেউ হতে পারেনা। বই আমাদের ঘরে বসে এমন অনেক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দেয় যা হয়ত আমাদের পক্ষে কোনোদিনই পাওয়া সম্ভব হবেনা। যেমন, পদ্মানদীর মাঝি আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় জেলেদের জীবনের সাথে, হাজার বছর ধরে আমাদের দেখায় গ্রামবাংলার মানুষের সংগ্রাম, একাত্তরের দিনগুলি আমাদের অদেখা মুক্তিযুদ্ধের এক অনুপম সময়ের সাক্ষী হবার সুযোগ দেয়। এভাবেই পৃথিবীর ইতিহাসের একটি একটি মূহুর্ত যেন ধরে রেখেছে বিশ্বের বইয়ের ভান্ডার। তাই বই শুধু বই নয়, বই স্বয়ং সময়।

বাংলাদেশে প্রথমবারের মত আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষাঙ্গণে বিশ্ব বই দিবস পালন করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইন্সটিটিউট ( BICLC)। সেদিন তারা শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেন নতুন বই এবং দিনব্যাপী জমজমাট আলোচনার মাধ্যমে তাদের সামনে তুলে ধরেন ভালো বই খুঁজে বের করা এবং পড়ার প্রয়োজনীয়তা।

বাংলাদেশে প্রথম তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে পাঠদানও শুরু করেন তারা। বিশ্বসাহিত্যের সাথে বাংলা সাহিত্যের মেলবন্ধন এবং বিশ্ব দরবারে বাংলা সাহিত্যের গুরুত্ব তুলে ধরতে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে তারা।

শিক্ষার্থীদের কাছে বইয়ের গুরুত্ব তুলে ধরতে তারা নানা আয়োজনের মাধ্যমে পালন করে বই দিবস। ভাবতে অবাক লাগে, বই দিবসে বই দিবসের মত এত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন বাংলাদেশে সেভাবে পালন করা হয়না। বিশেষত স্কুল কলেজ পর্যায়ের তরুন শিক্ষার্থীদের মধ্যে বইয়ের প্রতি আলাদা আগ্রহ তৈরি করতে বই দিবসের চেয়ে বড় কোনো দিন হতেই পারে না।

আজকের তরুণ প্রজন্মই আগামী দিনের কান্ডারী। তাদের মধ্যে বইয়ের মাহাত্ম্য ছড়িয়ে দিতে না পারলে স্বভাবতই ক্রমশ বইবিমুখ হয়ে উঠবে আমাদের এই জাতি। বাঙালি জাতি সাহিত্য এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কখনোই আপোষ করেনি। আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে যদি সেভাবে গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে সেটা আমাদের জন্য যথেষ্টই ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত হবে। আমাদের বেশিরভাগ মানুষ জানেই না বই দিবস কবে। এর অন্যতম একটি কারণ বই পড়াটা ক্রমশ সাধারণ শ্রেণীর মানুষের কাছে বিলাসিতায় পরিণত হচ্ছে। ফেসবুক, ইউটিউবসহ অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ার ভিড়ে মানুষ তাদের অবসর হারিয়ে ফেলছে।

একটা সময় ছিলো যখন মানুষ তাদের শখ কিংবা অবসরের প্রিয় কাজ হিসেবে উল্লেখ করত বই পড়া। মানুষ বই কিনত, পড়ত এবং অন্যকে পড়তে উৎসাহিত করত। জন্মদিন, বিয়ে কিংবা বিবাহবার্ষিকীর মত সামাজিক অনুষ্ঠানে উপহার দেয়া হত বই। আমরা কি শুধু সেসব দিনগুলোকেই হারিয়ে ফেলছি? না।

চারিদিকে তাকালে দেখতে পাই শুধু বই কিংবা বই পড়ার অভ্যাসকেই আমরা হারাচ্ছিনা। আমরা হারাচ্ছি আমাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি, রুচি এবং বিবেক। আজকের সমাজে যে ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা, ধর্মান্ধতা, অসততা, বিবেকহীনতা জায়গা করে নিয়েছে, তার জন্য কি মানুষের বইয়ের প্রতি বিমুখ আচরণ দায়ী নয়? বই সমাজের আয়না, মানুষের সামনে তার চারিদিকের অসংগতি তুলে ধরে বই। বই মানুষকে অনেক বেশি মানবিক করে তোলে। বই মানুষকে শিক্ষা দেয়, মানুষকে অন্ধত্ব থেকে মুক্তি দেয়, মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে, মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করে তোলে। তাই আসুন, এই বই দিবসে আমরা বইকে আবার আপন করে নেই। বই কিনি, বই পড়ি এবং অন্যদের বই পড়তে উৎসাহিত করি। শেষ করছি বিখ্যাত লেখক জে কে রাউলিংয়ের একটি উক্তি দিয়ে,

“তুমি যদি বই পড়তে ভালো না বেসে থাকো, তাহলে হয়ত তুমি এখনও সঠিক বইটি খুঁজে পাওনি।”
ভালো বই, পড়বই।

দিলশাদ চৌধুরি, শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here