বিবর্তনের শৈশব: সেকাল

মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণের ফলে ছোটকাল থেকেই নানা চড়াই উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে বড় হতে হয়েছে। শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে আজ জীবনের মধ্য গগনে। ব্যস্ত জীবনের হিসেবের খেরোখাতায় যান্ত্রিকতা আর কৃত্রিমতায় যখনি হাফিয়ে উঠছি ক্রমাগত তখনি দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে মনের অজান্তেই গান গাইছি- আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম? অতীত আর বর্তমানের মধ্যে কাটা কম্পাস দিয়ে বিভাজন রেখা টেনে সুন্দরের আপেক্ষিক ব্যাখ্যা হয়তো আছে অতীত-বর্তমানের পক্ষে-বিপক্ষে, তথ্য-উপাত্ত আর যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে স্মৃতি রোমন্থনে নস্টালজিক হয়ে আবেগতাড়িত অশ্রুসিক্ত অভিব্যক্তিই হয়তো বলে দিবে কোন অধ্যায়ে ভাল ছিলাম। শৈশব বিবর্তনের সেকাল-একালের দুই পর্বের আলোচনায় সেটিই তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

ফেলে আসা অতীত আমার স্মৃতির দর্পন যা চোখ দিয়ে দেখেছি, হৃদয়ে ধারণ করে অতীতের ডেক্সটপ ফাইলে রেখেছি স্ব-যতনে। অতীতের স্মৃতিগুচ্ছ সারি সারি করে সাজানো একেকটা মহা মূল্যবান দলিল দস্তাবেজ যেটি বয়সের ভারে ন্যূজ হয়ে পরা একজন বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার শেষ জীবনে উত্তর প্রজন্মের কাছে উগলে দেবার পথ্য। চাইলেও ভুলতে পারি না ছোট বেলার সেই দিনের স্মৃতিগুলো যা জীবনের পাতায় ছায়া হয়ে পেছনে হেঁটে বেড়ায় সর্বক্ষণ। আমাকে মাঝে মাঝে স্মৃতি কাতর করে, টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যায় সেই মাটির আঁকা বাঁকা মেঠো পথে, মটরশুঁটির লতায়, হলুদ সরিষা ফুলের ক্ষেতে, গ্রামের ছোট ছোট নালা-দীঘির জলে, শাপলা ফোঁটা ঝিলের ধারে; বাদল ও দিনের কদম ফুলে, আম গাছের তলায়, জাম গাছের মগ ডালে, শীতের সকালে কুয়াশা চাঁদরে মোড়া খেজুর গাছের তলে, মাটির কলসে ভরা সেই টাটকা স্বাদের রসের কাছে।সুনিবিড় শান্তির নীড়, দক্ষিণের খোলা জানালা, সারি সারি গাছের বাতাসি দোলে হৃদয় প্রক্ষালন, সাথে শাঁন বাধানো কিংবা মাটির শক্ত ঘাঁটে দলবেঁধে গোসল, দোলনায় দোল খাওয়া, টলমলে পুকুরের পানি, ভোর ডাকা পাখির কলকাকলির সুর আমাকে আজও হাতছানি দিয়ে জাগ্রত করে।

ছোট বেলায় গ্রামের মাটির ঘর, বাঁশের বেড়া, নেড় অথবা শন দিয়ে বাঁধা চাল, ঘন সেই সবুজ প্রাকৃতিক পরিবেশে অবারিত নির্মল শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে বড় হওয়া, পাশের বাড়ির ঘরে আগুন নিভিয়ে মনোতৃপ্তির ঢেকুর তোলা, পাড়ার ঝগড়াটে মহিলার ঝাঁঝালো কন্ঠের বিপরীতে সুখে দুখে সবার আগে দৌড়ে এসে অভয় দেয়া, দল বেঁধে গাছ তলায় গল্প করার ধারাবাহিক রুটিনওয়ার্ক ছিল । যখনি চোখ বন্ধ করে শরীরটা হেলিয়ে নিদ্রায় যাই, তখন চোখের সামনে খেলা করে দিগন্ত বিস্তৃত শস্য-শ্যামল সবুজ খোলা মাঠ, নীল আকাশের মুক্ত তারা, সোনালী ধানের শীষ,পাট পচাঁ গন্ধ আর রকমারি অনুসঙ্গ। আমি যেন শৈশবের আগের মতই শুনতে পাই রাখালের সেই মধুমাখা বাঁশের বাঁশির সুর, মাঝির দরদি কণ্ঠের ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, জারি, সারি, মারফতি, চটকা, মহুয়া, মলুয়ার যাত্রাপালার গান অথবা আসর জমিয়ে গানের বাহাসে স্রষ্টার সৃষ্টির গূঢ় মাহাত্ম তুলে ধরার বুদ্ধিভিত্তিক প্রতিযোগিতা। শৈশবের জীবনকে যতই পথের বাঁকে পিছনে ফেলে বর্তমানের সাথে খাপ খাওয়াতে চাই, ততই ফিরে যাই শৈশবের শিকড়ে। ফেলে আসা শৈশব-কৈশোরের দিনগুলো আমাকে তাড়িত করে মৌলিক জীবনের পথে। আনমনেই চোখের স্ক্রীনে ভেসে ওঠে চিরচেনা মেঠো পথ, সতেজ বাতাস, পাখির গান, ফুলে ফুলে প্রজাপতির নাচ, প্রয়োজনে কিষাণি, রাখাল হওয়ার কতশত অনুগল্প।

দল বেঁধে সকালে মক্তবে যাওয়া, স্কুলের ক্লাস শুরুর আগে এলোমেলো দৌড়ঝাঁপ, গোল্লাছুট, কাবাডি, দাড়িয়াবান্ধা, ডাংগুলি, কানামাছি, সাহেব বিবি গোলাম, বাঘ-ছাগল আর বৌছি খেলার দিনগুলি যেন সোনায় মোড়ানো প্যাকেজ ছিল। স্কুল থেকে ফিরে খাবারটা খেয়েই বিকালে মাঠে ফুটবল, ক্রিকেট খেলা। কখনো স্কুল ফাঁকি, জাল দিয়ে, হাত দিয়ে, বাঁধ দিয়ে মাছ ধরা, ক্ষেতের ভিতর সদ্য তোলা আলু, মশুর, মটরশুটি পুড়িয়ে ভাগাভাগি করে খাওয়া, চাঁদা তুলে পিকনিক করা, আম, জাম, কাঠাল, লিচু, নারিকেল গাছের উপর চাতক দৃষ্টি যেন শিশু কিশোর বেলার প্রতিষ্ঠিত চরিত্র। সেই সব দিনগুলি কী করে ভুলে আত্বস্থ করছি, ধাতস্থ হচ্ছি নতুনের সাথে এই আমি ভাবতেই কেমন যেন লাগে এ যেন বন্দি শিবির থেকে বলা কয়েদির আর্তনাদের ময়না তদন্তের পরীক্ষা চলছে!

শৈশবের প্রতিটি মুহূর্ত যেখানে রয়েছে একেকটা মহামূল্যবান গল্পের সাসপেনসান, কোনটাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করবো আর কোনটাকে নিয়ে স্বপ্নের তুলি দিয়ে ছবি আঁকব তা বলা মুশকিল। শৈশবের প্রতিটি দিন যেখানে মধুভরা, আনন্দময় ছিলো সেখানে কোন দিনটাকেই বিশেষ ভাবে স্মরণ করবো! শীতকালে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলে সবাই নানা বাড়ি আর আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যেতাম । পিঠা পায়েশের সাথে মাংস ছিল কাংখিত খাবার মেনু। মাংসের আয়োজনে সবাই মিলে হাঁস-মুরগী ধরার যে কসরত দেখাত তা ছিল দারূন উপভোগ্য। জামাই আসলে মা-চাচীদের ঘুম ছিল হারাম, রাতভর পিঠাপুলি তৈরি, সকাল বেলা খোঁয়ার থেকে হাঁস-মুরগীর ডাকেই বুঝে যেতাম মজার খাবার তৈরি হবে নিশ্চিত। এই জন্যই পল্লীকবি জসিমউদ্দিনের “মামার বাড়ি” কবিতা ছিল পছন্দের তালিকায় প্রথম। পঁচিশ পয়সার আইসক্রীম, ভাঙ্গারির বিনিময়ে নই/লই/মটকা, হাওয়া মিঠাই ছিল আরাধ্য। স্বল্প মূল্যের পুঁজির জন্য মায়ের আচল ছিল নিরাপদ ঠিকানা। অনেক অনুনয় বিনয়ের পর আঁচলের গাঁট থেকে পয়সা উদ্ধার হলে বদন জুড়ে স্ফীত হাসি উপচে পড়তো যেন রাজা-বাদশাহদের রাজ্য জয়ের চেয়ে কোন অংশে কম ছিল না। ঘুম পাড়ানো অথবা ভয় দেখানোর জন্য ভূত-প্রেত, রাক্ষস কিংবা খাক্ষস তো ছিলই। ইলিশ এবং তেলে ভাঁজা পিঠা সন্ধ্যাকালে স্মশানঘাট, তেতুল, শিমুল বা বড় গাছের নিচ দিয়ে যাওয়া ছিল বারণ কারণ ভূত অথবা জ্বীনের আছড় করার শব্দ ছিল লোকের মুখ মুখে। মাঝে মাঝে জ্বীন ভূতে ধরা রোগী পাওয়া যেত আর কবিরাজ এসেই বলত খারাপ ভূত বা জ্বীন ধরেছে। ঝাঁর-ফুকের নামে চলত রোগীর উপর অকথ্য নির্যাতন। ভূতকে বোতল বন্দী করার গল্প ছিল অহরহ। ধনুষ্টংকার হলে তো রক্ষাই ছিল না। কুসংস্কারে ভরা এই সব খয়রাতি চিকিৎসা আর অন্যান্য রোগের বেলায় হাতুরে ডাক্তারই ছিল একমাত্র ঠিকানা।

শৈশব-কৈশোরের দুরন্তপনা আর ডানপিটে জীবন যাপন আমার মত প্রতিটি মানুষের জীবনের ফ্লাশব্যাক । বিনোদনের মাধ্যম বলতে এখন যা বুঝায় আমাদের সময় তা ছিল না। ব্যাটারি চালিত সাদা কালো টেলিভিশন আর রেডিও ছিল একমাত্র ভরসা । বিটিভি ছিল একমাত্র চ্যানেল। শুক্রবার ছিল বাংলা সিনেমা প্রচারের কাঙ্খিত দিন। আর এই ছবি দেখার জন্য টিভিওয়ালাদের সাথে নানা ভাব যোগানের কৌশলও কিন্ত কম বেশি প্রয়োগ করা হত। এমনও হয়েছে সিনেমার মাঝখানে এসে কর্তাবাবুর ছেলে বা মেয়ে ধাম করে টিভি বন্ধ করে দিয়েছেন যা দর্শক হিসেবে যথেষ্ট মনোঃকষ্টের কারণ ছিল।

আলিফলায়লা, সিন্দাবাদ, ম্যাকগাইভার, রবিনহুড ছিল আমাদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়। উল্লেখ্য বাংলা সিনেমায় ফাইটিং দৃশ্যগুলো ছিল স্বপ্নের মত। যদিও সেই সময় টিভি বা সিনেমা দেখা পারিবারিকভাবে অনেকটাই ট্যাবুর মত ছিল । পিতা-মাতা, মুরব্বিদের সম্মান করা ছিল ব্রত, শাসন ছিল কড়া আর শিক্ষকদের মনে করা হত ভগবান তুল্য। শিক্ষকের রুমে ঢুকতে গেলে অনুমতির পাশাপাশি জুতাখুলে প্রবেশের মত উদারতা ছিল অভিভাবক আর শিক্ষার্থীদের মাঝে। পালকি, ঢুলি আর গরুর গাড়িতে ধুমধাম বিয়ে করার রেওয়াজ ছিল। যৌতুক বলতে হিরো সাইকেল, পাঁচ, দশ হাজার টাকার চাহিদাপত্র। আর বরযাত্রী আসার কথা শুনলেই পটকা ফুটিয়ে দড়ি দিয়ে রাস্তা রোধ করে টাকা আদায় করার ঘটনাও কম বেশী পটু ছিলাম তা বলা যেতেই পারে।

শৈশবে খেলার সামগ্রির মধ্যে খড়কুটো, জাম্বুরা দিয়ে বানানো বল, ঘরের কোণায় পরে থাকা কাঠের টুকরো দিয়ে ব্যাট বানিয়ে টেনিস বল দিয়ে বন্ধু,সহপাঠিদের সাথে প্রান উজার করে খেলা, অবশ্য সেই সময় যাদের বল ছিল তাদের কদর ছিল সীমাহীন। সাঁতার কাটা, কৃষকের ছেলে হিসেবে রাত জেগে বাড়ির উঠানে গরু দিয়ে ধান মাড়ানো ছিল অবধারিত। মাগনা কামলার নামে সেরা প্রতিভা ‘পেটুক’ অনুসন্ধান করা, অকালে বন্যা মোকাবেলায় সকলে মিলে বাঁধ নির্মাণ অন্যতম চ্যারিটির মধ্যে গন্য হত।

যাদের শৈশব আর কৈশোরটা গ্রামে কেটেছে, তাদের জীবনের এই দৃশ্য আর অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবন চলার অনবদ্য সলতে। কারণ ফেলে আসা দিনগুলো ছিল নিষ্পাপ, পুত ও পবিত্র, মায়া, প্রীতির বন্ধনে মনে রাখার মত গোল্ডেন পিরিয়ড যা কখনো ভোলার নয়।

আমাদের এই দ্রুততর জীবনে একটু যদি অবসরে বসে যাই, তাহলে আমাদের চোখের সামনে প্রথমেই যে ছবিটা ভেসে ওঠে সেটা হল শৈশব আর কৈশোরের চিত্র। আমরা চোখ বন্ধ করে মুহূর্তে দেখে নেই স্মৃতির মহাকাব্য। অবাধ্য জীবনের দুরন্ত স্মৃতিগুলো মনে হলে যেন ছুটে যাই সেই গাঁয়ে, ডেকে নেই সব বন্ধুদের, আবার দল বেঁধে সেই শৈশবের পথে ছুটে যাই । শৈশব স্মৃতির সাথে জড়িয়ে থাকা সকল বন্ধু,সহপাঠি,আত্মীয় স্বজন,প্রিয়জন সবাই ভাল থাকুক; সুস্থ থাকুক।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here