পৌষের এই কনকনে শীতের সকালে শীত ও বৃষ্টির মিশেল আবহাওয়ার মধ্য দিয়েই ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে আমরা বরণ করে নিয়েছি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী ২০২০ সালকে। উত্তরের হিমেল হাওয়া যেরূপ বয়ে চলেছে ঠিক সেরূপেই হৃদয়ে আন্দোলিত করছে বাঙ্গালী জাতিসত্তার ইতিহাস, লড়াই, সংগ্রাম, অর্জন ও অনুভ‚তির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৭২তম জন্মবাষিকী। ১৯৪৮ সালে ৪ঠা জানুয়ারি সময়ের প্রয়োজনেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল শিক্ষা, শান্তি ও প্রগতির পতাকাবাহী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। প্রতিষ্ঠাকালীন নাম ছিল, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালে কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে অসাম্প্রদায়িকতার রক্ত শপথে গড়ে উঠেছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

বিদ্যার সঙ্গে বিনয়, শিক্ষার সঙ্গে দীক্ষা, কর্মের সঙ্গে নিষ্ঠা, জীবনের সঙ্গে দেশপ্রেম এবং মানবীয় গুণাবলীর সংমিশ্রণ ঘটিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ অতিক্রম করেছে পথচলার গৌরবান্বিত ৭২ বছর। জন্মের প্রথম লগ্ন থেকেই ১৯৪৮ সালের ১১মার্চ বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে সাধারণ ধর্মঘট ডাকে এদেশের ছাত্রসমাজ। সেদিন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ছাত্রসমাজের অগ্রগামী সৈনিক শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর অন্যান্য সহযোগীরা।

১৯৪৯ সালের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে নিঃশর্ত সমর্থন দেয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। কর্মচারীদের দাবী আদায়ে শোভাযাত্রাসহ বিক্ষোভ কর্মসূচী পালন করলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২৭ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। শাস্তিপ্রাপ্ত এই ছাত্রদের মাঝে অন্যতম ছিলেন ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুকে ১৫ টাকা জরিমানা করলে তিনি মুচলেকা দিতে অস্বীকার করেন। যার ফলশ্রুতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাঁর ছাত্রত্ব কেড়ে নেয়।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে আন্দোলন জোরালো করার ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের অবদান প্রণিধানযোগ্য। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে নৌকার বিজয় ছিনিয়ে আনতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিদেশনায় ৫৬ হাজার বর্গমাইলে জেগে উঠেছিল জাগরণের উৎসবে।

১৯৫৮ সালের সালের আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিল এদেশের ছাত্রসমাজ। ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলনের মাধ্যমে আইয়ুব খানের পতনের ডাকে নেতৃত্ব দিয়েছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। ১৯৬৪ সালের ভয়াবহ দাঙ্গার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ ছাত্র-জনতার সাথে যুথবদ্ধ হয়ে গড়ে তুলে ‘‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়ে দাঁড়াও আন্দোলন’’। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত ৬-দফা দাবীকে এক দফা দাবিতে পরিণত করতে পূর্ব বাংলায় জনমত গড়ে তুলে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

১৯৬৮ সালে আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রতিহত করতে ও তাঁদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাগারের শিকল থেকে মুক্ত করতে রাজপথে আন্দোলন কর্মসূচির ডাক দেয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। পাকিস্তানী শাসকেরা বাংলার ছাত্রসমাজের তুমুল আন্দোলনের কাছে পরাজিত হয়ে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য বন্দীদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

পরের দিন ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানের ছাত্রসমাজের বিশাল সংবর্ধনা সভায় শেখ মুজিবকে ‘‘বঙ্গবন্ধু’’ উপাধিতে ভূষিত করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানেও বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ছিল রাজপথের লড়াকু সৈনিক। সেবছর ছাত্রদের ১১ দফা দাবী আদায়ের ৮১ দিনের মাথায় স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকারের পতন ঘটেছিল। ১৯৭০-এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতাকমীরা সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৯৭১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগের আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানীদের কোন রকম চাপের কাছে নতী স্বীকার না করার আহ্বান জানানো হয়।

ছাত্রলীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ বলেন, ভুট্টো সাহেবরা এখানে আসতে না পারলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তারা ওখানে বসেই পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করুন। আমরা এখানে বাংলার শাসনতন্ত্র কায়েম করবো। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দকে ডেকে নিয়ে স্বাধীণ বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে বলেন।

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই ছাত্রলীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসু ভিপি-জিএসের সমন্বয়ে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ১ মার্চ রাতে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে (ইকবাল হল) ৮ ছাত্রনেতার এক ঐতিহাসিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সভায় প্রথম বাংলাদেশের পতাকা ও জাতীয় সংগীতের রূপ নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। সিদ্ধান্ত হয় ২ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সভায় স্বাধীনতার প্রস্তাব পাঠ করা হবে।

পরদিন স্বাধীণতার প্রস্তাব পাঠ ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু দৃঢ়কণ্ঠে উচ্ছারণ করেন ‘‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’’।

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে, বঙ্গবন্ধু গ্রেফতারের আগ মূহুর্তে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ঝাঁপিয়ে পড়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীসহ বাংলার আপামর জনগণ।

ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা সাবেক ও বর্তমান ৮ নেতার নেতৃত্বে ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। প্রথমে এর নাম দেওয়া হয় ‘‘বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স’’ পরে ‘‘মুজিব বাহিনী’’ নামে বিশেষ পরিচিতি লাভ করে।

মহান মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগের ১৭ হাজার নেতাকর্মী শহীদ হন।

পৃথিবীর অন্যকোনো রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ছাত্রসংগঠনের এমন ত্যাগের ইতিহাস পাওয়া দুষ্কর। তাই নির্দ্বিধায় বলতে চাই, বাংলাদেশ তুমি একটু হলেও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কাছে ঋণী।

স্বাধীণতা পরবর্তী বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অবদান অপরিসীম। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে যখন বঙ্গবন্ধু সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ও স্বয়সম্পূর্ণ করে তোলায় মগ্ন, ঠিক তখনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সংঘঠিত হয় বাংলাদেশের ইতিহাসের এক পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সর্বপ্রথম রাজপথে নেমে তুমুল আন্দোলন গড়ে তুলেছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। বাঙ্গালীর আস্থার শেষ ঠিকানা শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে ছাত্রলীগ মুকিযুদ্ধ ও গণতন্ত্রের চেতনা পূনরোদ্ধারের শপথ গ্রহণ করে।

‘শেখ হাসিনা ভয় নাই, আমরা আছি লাখো ভাই’ ঝড় বৃষ্টির আধার রাতে শেখ হাসিনা আমরা আছি তোমার সাথে’ এই- শ্লোগানের মাধ্যমে রাজপথে ঝড় তুলেছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। এরই ফলশ্রুতিতে ১৯৮১ সালের ১৭ মে লাখো শহীদের রক্তে কেনা বঙ্গবন্ধুহীন বাংলায় প্রত্যাবর্তন করেন দেশরত্ন শেখ হাসিনা।

স্বৈরাচারী শাসনসহ বিএনপি-জামাতের অপশাসনের বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন গড়ে তুলে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আরোহণের পিছনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

১৯৯৮ সালের বন্যায় মানবিক বিপর্যয় রোধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। ২০০১ সাল থেকে বিএনপি-জামাতের দুঃশাসন, সন্ত্রাস, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। এসময় আন্দোলন, সংগ্রাম করতে গিয়ে জেল-জুলুম, নির্যাতনের শিকার হয়েছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট দেশরত্ন শেখ হাসিনার উপর ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার প্রথম প্রতিবাদ করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারে প্রতিবাদে সাাদেশে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এবং ছাত্রলীগের আন্দোলনের কাছে নতী স্বীকার করে তৎকালীন সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

২০০৮ সালের নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অঙ্গীকার, ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন, মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে উজ্জীবিত হয়ে তরুণ সমাজের ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ২য় বারের মত সরকার গঠনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক, গণমুখী, বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হয়। এর গর্বিত অংশীদার এ সংগঠনটি।

বাংলাদেশকে যদি একটি বহমান নদীর সাথে সঙ্গে তুলনা করা হয়, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সে নদীর স্রোতধারা। নদীর স্রোতে যেমন নির্মল পানির পাশাপাশি আবর্জনাও প্রবাহিত হয়, ঠিক তেমনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগেও বিভিন্ন সময়ে অনুপ্রবেশকারী আগমনে সংগঠনটি বিতর্কের সম্মুখীন হয়েছে।

সকল বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ইতিমধ্যে ছাত্রলীগের গুণগত পরিবর্তন আনয়নে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ছাত্ররাজনীতির সংঙ্গায়ন, প্রয়োজনীয়তা বঙ্গবন্ধুর জীবন ও আদর্শের আলোকে ছাত্রজীবন গড়া প্রভৃতি দিক নির্দেশনা নিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ইতিমধ্যেই ‘‘Introduction to Leadership Orientation Program’’ কর্মসূচির আয়োজন করেছে। যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

আজ লাখো তরুণের প্রাণের স্পন্দন, ভালোবাসা আর ভালোলাগার সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৭২তম জন্মদিন। ছাত্রলীগের জন্ম না হলে, কখনোই বাঙ্গালীর লড়াই, সংগ্রামের ইতিহাস নির্মিত হতো না। এ জন্যই জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গর্ব করে বলেছিলেন ‘‘ছাত্রলীগের ইতিহাস বাঙ্গালীর ইতিহাস’’।

শুভ জন্মদিন, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনুকরণ ও অনুসরণে শিক্ষা, শান্তি, প্রগতির মশাল জ্বালিয়ে শিক্ষাবান্ধব, ছাত্রমুখী, মানবিক ও সৃজনশীল প্রয়াসের মাধ্যমে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এগিয়ে যাবে এক নব দিগন্তের পথে।

লেখক – তৌফিকুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল সংসদ
ক্রীড়া বিষয়ক উপ সম্পাদক, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ছাত্রলীগ

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here