ঢাকা | মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫,১ পৌষ ১৪৩২

মৃত্যু চান? ঢাকা শহরে আসুন

ঢাকা শহর নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। গাও-গ্রামের আমাদের মতো অধিকাংশ অভাগারা মনে করে, ঢাকার বাতাস কপালে লাগলে হয়তো সুদিন ফিরে আসবে। আবার যার স্বপ্ন আয়নার মতো ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, সে হয়তো এই শহরে আসে — তার কাছে ঢাকা মনে হয় স্বপ্নের শহর। তবে ঢাকা কতটা সেই স্বপ্ন পূরণ করে, তার পরিসংখ্যানে আর যাওয়া হয় না। শহরের রহস্যঘেরা অনেককিছুই আমাদের কাছে হয়ে থাকে অজানা।

তবে এটা সবার জানা,ঢাকা শহরে কোনো কিছুই পুরোপুরি বিনামূল্যে পাওয়া যায়না। পাঁচ টাকা ভিক্ষা নেওয়ার জন্যও আপনাকে গভীর সাধনা করতে হয়। তবে ঢাকা একদম কিছুই যে বিনা খরচে দেয় না, তা একেবারে সঠিক নয়। আপনি না চাইলেও, ঢাকা শহর আপনাকে সাদরে আপনার দোয়ারে মৃত্যুটা কমপক্ষে পৌঁছে দিবে। এতে কারো কাছে অনুনয় বা প্রার্থনা করার দরকার হবেনা।

ধরুন, আপনি চায়ের দোকানে গিয়ে একটা চা খাচ্ছেন। চা খেতে খেতে আকাশের দিকে তাকিয়ে অপার সুন্দর মেট্রোরেল অবলোকন করছেন। হঠাৎ বিচ্ছিন্নভাবে একটা বিয়ারিং ছুটে এসে আপনার জীবনটাই শেষ করে দিলো। বিশ্বাস রাখুন—এর জন্য আপনাকে একটি সিকি পয়সাও কাউকে দিতে হবেনা।

সম্প্রতি মেট্রোরেলের বিয়ারিং কান্ডে নিহত আবুল কালামের মৃত্যুতে তার পরিবারের কোন পয়সা খসাতে হয়নি কোন মামা খালু ধরতে হয়নি। এটাতো আর অন্যকোন বিষয়না যে তদবির লাগবে। মৃত্যু এই শহরে নৈমিত্তিক ব্যাপার সহজে আসে।

এখন প্রশ্ন হতে পারে, ‘ঢাকা শহরের সব জায়গায় কি মৃত্যু হয়?’ না, হয় না। চায়ের দোকানে চা না খেলেই ত হিসাব চুকে যায়। যে শহরে প্রকাশ্য দীবালোকে মানুষকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়, সেখানে কোনস্থানকে নিরাপদ বলবেন? চুরি,ছিনতাই, ব্যাক্তিগত, রাজনৈতিক আক্রোশ বিভিন্ন কারণে অসংখ্যা মানুষ প্রতিনিয়তই খুন হচ্ছে। ডি এম পি বলছে, তাদের কাছে গত কয়েক মাসে দূর্বৃত্তদের হাতে হত্যার মামলা প্রায় চারশটি।

জীবনে কতকিছু আয়োজন করে হয় কিন্তু মৃত্যু তা হয়না । তবে এই শহরের পরতে পরতে মৃত্যুর ফাঁদ দিয়ে আয়োজন সাজানো আছে। যানবাহনে উঠবেন গন্তব্যে পৌঁছাতে, কিন্তু এই রাস্তায় জীবনের শেষ গন্তব্যে হবেনা তার নিশ্চয়তা কমপক্ষে এই ঢাকার কেউ দিতে পারবে না। কারণ ঢাকার মানুষ ভালো করেই জানে গত এক বছরে শুধু ঢাকায়— ১,৫৮২টি দুর্ঘটনায় ১,৮৪০ জন প্রাণ হারিয়েছে।

শহরের মৃত্যুর মিছিল থেকে অবশ্য দ্বিজেন্দ্রলাল রায়’র কবিতার “নন্দলাল” মনে হয় বেঁচে যেতেন কারণ তিনি ত ঘর থেকে বের হতেন না। তবে এই ঢাকা শহরে, নন্দলালেরই কী ঘরের-ভিতরে বেঁচে থাকার সুযোগ আছে? বেইলি রোড, মিরপুরের গার্মেন্টস, বিমানবন্দরের মতো আবদ্ধ ঘরে আগুন লাগবেনা, প্রাণ ঝড়বেনা, নিহতের পরিবারে কান্নার রোল ঢাকার বাতাস ভারী করবেনা—এটা কে নিশ্চিত করতে পারে?

বিগত কয়েক বছরে শুধু ঢাকাতেই আগুনে পুড়ে গেছে হাজারেরও বেশি মানুষ। স্বপ্নের এই শহরে মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করার খুব প্রয়োজন আছে বলে হয়না —কারণ চারদিকেই মৃত্যুর খেলা চলছে। যেখানে শিক্ষার্থীরা টিউশনে গিয়ে সিঁড়িতে গলাকাটা লাশ হয়ে যায়।সেখানে বেঁচে থাকাটাই পরম সৌভাগ্যের । রাজনৈতিক জীবনে নামলে মৃত্যুর খেলায় সে অবশ্য একটু এগিয়ে যায়। রাজনৈতিক কারণে শহর থেকে গুম হয়েছে বহু মানুষ। এক প্রতিবেদন বলছে ,গত এক দশকে শহর থেকে ১,৭৭৩ জন মানুষ গুম হয়েছেন।

ঢাকা শহরে এই কয়েক মাসে মৃত্যুর প্রতিযোগিতাকে টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছে এডিশ মশা — প্রত্যেকদিন ডেঙ্গুতে প্রাণ যাচ্ছে মানুষের। স্বাস্থ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী চলতি বছরের ডেঙ্গুতে শুধুমাত্র ঢাকাতে প্রাণ গেছে ১৬৩ জনের।

মৃত্যু এমন জিনিস যা কৌশল বা রাজ্যের কোনো কিছু দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। অন্য স্থানে বা গ্রামে যে মানুষ মরে না বিষয়টা এমন নয়। তবে রাজধানী হওয়ায় ঢাকা অন্যসব বিষয়ের মতো মৃত্যুর মিছিলেও বরাবরই “সেরা। ঢাকার উন্নয়ন হয়েছে, ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে, তবে অনাকাঙ্ক্ষিত, পরিকল্পিত মৃত্যুর কারণ দর্শিয়ে কোনো সুস্পষ্ট পদক্ষেপ আমরা দেখিনি। যারা শহর নিয়ন্ত্রণ করে তারাই যদি শহরকে রাক্ষস করে তোলেন, তাহলে সে শহর মানুষ খাবে এটাই ত স্বাভাবিক। আর প্রতিমুহূর্তে মায়ের ছেলেদের ডাক দেবে — “মৃত্যু চান? ঢাকা শহরে আসুন।”

আমার সোনার বাংলা কী এভাবেই চলবে?—মায়ের ছেলেরা স্বপ্ন পূরণের জন্য ঢাকা আসবে, আর লাশ হয়ে ফিরে যাবে।

আহমদ জুবায়ের
শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।