পর্যটনের অপার সম্ভাবনা হাওরের সূর্যমুখীর ক্ষেত

সুনামগঞ্জে হাওরে ফেব্রুয়ারি মাসে বসন্তের মৃদু হাওয়ায় প্রতিটি ডোলে যেন ফুটে আছে ফুটন্ত সূর্য। জামালগঞ্জের রামপুর ও বিশ্বম্ভরপুরের ভাদেরটেকের সালামপুর এলাকা এ বছর হঠাৎ করে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছে সূর্যমুখী বাগানকে ঘিরে। হলুদের ছোঁয়া লাগানো সূর্যমুখীর ক্ষেত হয়ে উঠেছে নতুন এক পর্যটন কেন্দ্র। পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে হাওরের এই সূর্যমুখীর ক্ষেতে।

সূর্যমুখী বাগানের সৌন্দর্যপীপাষুদের ছবি এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবার দৃষ্টি কেড়েছে।

কৃষি বিভাগের প্রণোদনায় বাণিজ্যিকভাবেই কিছু জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ করেছেন স্থানীয় কৃষক।

তবে জানা গেছে, শ্রমিক সংকট, উচ্চ মজুরি, কৃষি উপকরণের চড়া দাম, ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি হওয়ার কারণে বোরো আবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন কৃষকরা। অপ্রচলিত শস্য (ভুট্টা, সরিষা, সূর্যমুখী) আবাদ করতে খরচ কম কিন্তু উৎপাদন বেশি ও লাভজনক। ফলে এসব ফসলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন তারা।

বুধবার শেষ বিকেলে জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাঁক ইউনিয়নে রামপুর গ্রামে সূর্যমুখীর প্রদর্শনী প্লট পরিদর্শন করেন সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ। এসময় জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ সফর উদ্দিন, জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রিয়াংকা পাল, উপজেলা কৃষিকর্মকর্তা আজিজুল হক, জেলা-উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিবৃন্দ, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত লোকজন উপস্থিত ছিলেন।

জানা যায়, ওই গ্রামের কৃষক তাজ উদ্দিন জামালগঞ্জ উপজেলা কৃষি সম্প্রাসারণ অধিদফতরের প্রণোদনায় ৩৬০ শতাংশ জমিতে সূর্যমুখী চাষ করেছেন। এতে আনুমানিক ব্যয় হয়েছে ৯৬ হাজার টাকা। ২৫ হাজার চারা লাগিয়ে প্রায় ২ লাখ টাকা বিক্রি হবে বলে জানান তিনি।

অপরদিকে কৃষক অব্দুর রহমান জানান, ধানের বিকল্প হিসেবে সূর্যমুখীর আবাদ করছেন তিনি।

কৃষক সালাম মিয়া জানান, ৩০ শতক জমিতে ধান উৎপাদন করতে খরচ হয় কমপক্ষে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা। ধান পাওয়া যায় ১০ থেকে ১২ মণ। অন্যদিকে একই পরিমাণ জমিতে ভুট্টা চাষ করলে খরচ হয় দুই হাজার টাকা। ভুট্টা উৎপাদন করা যায় ৩০ মণ, যার বাজার দর ২৪ হাজার টাকা। এই হিসেবেই তারা ধানের পরিবর্তে জমিতে এসব ফসলের উৎপাদন করছেন।

হাওরবাসী বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল। প্রকৃতির খেয়ালখুশির ওপর নির্ভর করে বোরো ধানের উৎপাদন। আগাম বন্যা, অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টিসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাওরের বোরো ফসল।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র মতে, চলতি অর্থবছরে ভুট্টা ৪২৭ হেক্টর, সরিষা ২ হাজার ১১৫ হেক্টর, সূর্যমুখী ২৭ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে।

এদিকে, বিশ্বম্ভরপুরের ভাদেরটেকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঘুরতে এসে বলেন, যাত্রাপথে হলুদবর্ণের ফুল আমাদের কাছে টেনে নিয়েছে। ঢাকার এক পর্যটক জানান, ফুলের সৌন্দর্য্যে কিছু সময় আনন্দে থাকতেই সূর্যমুখীর বাগানে এসেছি। এভাবে প্রায় প্রতিদিনই নানা প্রান্ত থেকে পর্যটকরা আসছেন।

কৃষকরা জানান, ধানের চেয়ে শস্যের দাম কয়েক গুণ বেশি এবং উৎপাদন খরচ কম ও ঝুঁকি কম থাকায় তারা ধানের পরিবর্তে জমিতে ভুট্টা সরিষা ও সূর্যমুখীর আবাদ করছেন।

এ ব্যাপারে জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রিয়াংকা পাল বলেন, জামালগঞ্জে সূর্যমুখীর প্রদর্শনী প্লটে বাম্পার ফলন হবে আশা করি।

সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মোহাম্মাদ সফর উদ্দিন বলেন, কৃষি খাতে সূর্যমুখী চাষে বিপ্লব ঘটবে। আমাদের আরো ৯টি প্লট রয়েছে এটা সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী।

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মাদ আব্দুল আহাদ বলেন, হাওরাঞ্চলের সাধারণ কৃষকরা সূর্যমুখী চাষে আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সূর্যমুখী চাষের জন্য সরকারিভাবে যতটুকু সম্ভব ততটুকু সহযোগিতা করা হয়েছে। সূর্যমুখী প্রদর্শনী প্লট দেখার জন্য বিভিন্ন স্থান থেকে নারী-পুরুষরা ভিড় জমাচ্ছেন। কৃষকরাও দেখার জন্য আসছেন। হাওরের কৃষকরা সূর্যমুখী চাষে সাফল্য আনবে বলে আশা করছি। [সূত্র: নয়া দিগন্ত]

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here