পরীক্ষায় অনিয়ম : শাস্তির বদলে যেন পুরস্কারই পেলেন সেই শিক্ষিকা!

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সাবেক দুই উপাচার্যের দুই দফা তদন্তে পরীক্ষায় খাতা জালিয়াতি, পছন্দের শিক্ষার্থীকে সাজেশন প্রদান, হলের বাইরে নিয়ে গিয়ে অতিরিক্ত উত্তরপত্রে লেখার সুযোগসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের প্রমাণ মিলেছিল। যে কারণে সংস্কৃত বিভাগের শিক্ষিকা অধ্যাপক সুপ্তিকণা মজুমদারকে গত বছরের মার্চে বরখাস্ত (ডিসমিস) করে তৎকালিক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু হঠাৎ নতুন উপাচার্য দায়িত্ব নিয়েই সিন্ডিকেট ডেকে সুপ্তিকণাকে স্বপদে বহাল করলেন। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে চলছে সামালোচনার ঝড়। দেখা দিয়েছে শিক্ষকদের মাঝে ক্ষোভ।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর চবির চারুকলা ইনস্টিটিউটে সিন্ডিকেটের ৫২৬তম সভায় তাকে স্বপদে বহালের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিন্ডিকেটে হঠাৎ করেই এমন সিদ্ধান্তে এসেছে। এরই মধ্যে গত ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি বিভাগে যোগদান করেন।

জানা গেছে, ২০১৩ সালের তৃতীয় বর্ষ (সম্মান) পরীক্ষার ৩০৮ নং কোর্সের (প্রাচীন ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতি) পরীক্ষার কাজে দায়িত্বে অবহেলা, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং পরীক্ষার খাতা জালিয়াতির অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য বরাবর আবেদন করেন একই বিভাগের শিক্ষক তৎকালীন প্রভাষক (বর্তমানে সহকারী অধ্যাপক) লিটন মিত্র। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালের ৮ মার্চ অভিযোগের তদন্তে উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. এম আবদুল গফুরকে আহ্বায়ক করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য প্রফেসর আনোয়ারুল আজিম আরিফ। কমিটির অন্য সদস্যরা ছিলেন ফলিত ও পরিবেশ রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. হেলাল উদ্দীন আহমেদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক খালেদ মিছবাহুল মোকর রবীন। তদন্ত শেষে কমিটি লিটন মিত্রের আনা অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পায় এবং ড. সুপ্তিকণা মজুমদারের শাস্তির সুপারিশ করে।
এ ছাড়া এ ঘটনা তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এতে মার্কেটিং বিভাগের প্রফেসর এস এম সালামত উল্ল্যা ভূঁইয়াকে সভাপতি করে মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাজহারুল ইসলাম ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার ইসকান্দর মো. রেশাদুল করিমকেসহ তিন সদস্যের কমিটি করা হয়।

দ্বিতীয় দফা তদন্ত কমিটিও উল্লিখিত অভিযোগের সত্যতা পায়। এ ছাড়া পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন না করেও পারিশ্রমিক গ্রহণ, পরীক্ষা হলের পরিদর্শকের জায়গায় নিজের স্বাক্ষর- যা বেআইনি ও অনিয়ম, পরীক্ষা শুরু আধা ঘণ্টা আগে নির্দিষ্ট হল পরিবর্তন- যা সিদ্ধান্তহীনতা ও অব্যবস্থাপনা, নির্দিষ্ট পরিমাণের থেকে অতিরিক্ত পরিদর্শক নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ অপচয়- যা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইনকে ভঙ্গ করে এবং নিজের বই বিক্রির উদ্দেশ্যে তার কোর্সে সিলেবাসবহির্ভূত বিষয়কে পড়ানো- যা তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে জঘন্য অপরাধ বলা হয়।

দুই শিক্ষার্থী নয়ন মহাজন এবং ঝুলন দেব, যারা অভিযুক্ত শিক্ষকের প্রিয়ছাত্র বলে খ্যাত। তাদের সব কোর্সের সাজেশন দেওয়া, তাদের পরীক্ষার খাতায় অতিরিক্ত নম্বর প্রদানের অভিযোগের প্রমাণ মেলে। তখন তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়ানোর কথাও বলা হয় তদন্তের প্রতিবেদনে। উল্লিখিত অভিযোগের ব্যাপারে তার সঙ্গে কথা বলতে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হলেও তাতে সাড়া না দিয়ে উদ্ধত আচরণের পরিচয় দেন বলে কমিটি বলেছিল।

পরে সব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওই কমিটি ৪(১) ধারা অনুসারে সুস্পষ্টভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ভঙ্গের কারণে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি থেকে বরখাস্ত (ডিসমিস) করার সুপারিশ করে। এ অবস্থায় ৫২০ তম সভার ৩ (ঘ) সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে আনীত অভিযোগ তদন্তে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারী (দক্ষতা ও শৃঙ্খলা) সংবিধির ৪(১) ধারা অনুসারে প্রফেসর সুপ্তিকণাকে গত বছরের ১২ মার্চ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি থেকে বরখাস্ত (ডিসমিস) করা হয়।

কিন্তু সিন্ডিকেটের সর্বশেষ সভায় সুপ্তিকণার শাস্তি ‘মওকুফ’ করা হলো এবং তাকে স্বপদে বহাল করা হলো।

তার যোগদানের তথ্য নিশ্চিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার সৈয়দ ফজলুল করিম। তিনি বলেন, ‌‘গত সিন্ডিকেট সভায় আগের সিন্ডিকেটে নেওয়া সিদ্ধান্তের শাস্তি লঘু করা হয়েছে।’

তবে এ ব্যাপারে অভিযোগকারী শিক্ষক লিটন মিত্র হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন সিদ্ধান্তে অন্য শিক্ষকদের অনৈতিক কাজে উদ্বুদ্ধ করবে বলে আমার বিশ্বাস। এ যেন শাস্তির বদলে পুরস্কার!’  সূত্র: বিডি প্রতিদিন।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here