আজ রমজানের ২৭তম রাত। শবেকদরের অন্যতম সম্ভাব্য ক্ষণ। আল্লাহতায়ালা এ রজনীকে (শবেকদর) এত মর্যাদাবান করেছেন যে, এর সঠিক মূল্যায়ন মানুষের বোধ-বুদ্ধির বাইরে। আল্লাহতায়ালা এর মাধ্যমে মানবজাতিকে এক অভাবনীয় উপহার দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সে ঘোষণা দিয়েছেন এভাবে- ‘নিঃসন্দেহে আমি মহিমান্বিত রজনীতে কোরআন অবতীর্ণ করেছি। আপনার কি জানা আছে, মহিমান্বিত রজনী কী? মহিমান্বিত রজনী হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। সে রাতে ফেরেশতারা এবং রুহুল কুদুস (জিবরাঈল আ.) তার প্রতিপালকের নির্দেশে মঙ্গলময় বস্তু নিয়ে অবতরণ করেন। শান্তিই শান্তি সেই রাতে, ফজর হওয়া পর্যন্ত তা থাকে।’ (সুরা কদর)।

এ রাতের গুরুত্ব বোঝাতে আল্লাহই জিজ্ঞেস করছেন, ‘আপনি কি জানেন, লাইলাতুল কদর কী?’ কোরআন নাজিলের মাধ্যমে মানুষের প্রকৃত মূল্যায়নে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। অবিচার-অনাচারে ভরা পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হয় সুবিচারের মানদণ্ড। মানুষ তার বঞ্চিত অধিকার ফিরে পায়, মানবতা খুঁজে পায় মুক্তির ঠিকানা। সমাজের বুকে প্রত্যেকেই হন যথাস্থানে মর্যাদাবান। উঠে আসে বিজ্ঞান ও যুক্তিপূর্ণ বার্তা।

ইবনে আবি হাতেম (রা.)-এর রেওয়ায়েতে আছে, রাসুল (সা.) একবার বনি ইসরাইলের একজন মুজাহিদ সম্পর্কে আলোচনা করলেন। সে ব্যক্তি সারা রাত ইবাদতে মশগুল থাকত আর সকালে জিহাদের জন্য বের হয়ে পড়ত এবং সারা জীবন জিহাদ করেই অতিবাহিত করত। এভাবে এক হাজার মাস পর্যন্ত অবিরাম সে দিনে জিহাদ ও রাতে ইবাদতে কাটিয়েছিল। সাহাবাগণ এ কথা শুনে বিস্মিত হলে সুরা কদর নাজিল হয়। এতে এ উম্মতের জন্য শুধু এক রাতের ইবাদতই সেই মুজাহিদের এক হাজার মাস ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য হয়েছে।

ইবনে জারির (রহ.) আরেক বর্ণনায় লিখেন, পূর্ববর্তী যুগের দীর্ঘায়ু ধার্মিকরা বহু বছর পর্যন্ত ইবাদত-বন্দেগি করে এবং তাদের দীর্ঘ জীবনে বহু সৎকার্য করে অশেষ পুণ্যের অধিকারী হয়ে গেছেন। সুতরাং রাসুল (সা.)-এর সমসাময়িক অথবা পরবর্তী যুগের স্বল্পায়ু মুমিনদের পক্ষে প্রার্থনা বা ইবাদাত-বন্দেগি ও সৎকার্যে তাদের সমকক্ষ হওয়া কীভাবে সম্ভব হবে? একসময় নবী (সা.)-এর মনে এ চিন্তা এলে আল্লাহতায়ালা এ সুরা অবতীর্ণ করে তাকে সুসংবাদ দেন- ‘হে রাসুল, আমি আপনার ও আপনার অনুসারীদের জন্য এমন রাত রেখেছি, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।’ এ রজনী আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য বিশেষ দান। এবং এটি এ উম্মতেরই বৈশিষ্ট্য। (তাফসিরে জালালাইন)।

এ রাতের মূল আমল হল নিজের গুনাহখাতা আল্লাহ থেকে মাফ করিয়ে নেয়া। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, একবার আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি বলে দিন যদি আমি জানতে পারি যে, শবেকদর কোন রাতে হবে, তাতে আমি কী বলব? রাসুল (সা.) বললেন- তুমি বলবে, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আননি।’ (অর্থ) হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাস। অতএব, আমাকে ক্ষমা করো। (তিরমিজি)।

আল্লাহ তো তাঁর বান্দাকে ক্ষমা করতেই কদরের ব্যবস্থা করেছেন। তাই মূল্যবান এ ক্ষণটির তালাশে বান্দাকে রাতভর নিমগ্ন হতে হবে। এক মুহূর্তের অবহেলায়ও যেন হারিয়ে না যায় কদরের নিয়ামত।

তাই হে সিয়াম সাধক, হে নবীর আদরের উম্মত, আসুন আমরা আল্লাহর এ বিশেষ উপহার কদর রাতকে কাজে লাগিয়ে নিজের ভাগ্য বদল করি। সুন্দর আগামীর প্রত্যয়ে আজ থেকে শুরু হোক আমাদের পথচলা। খোদার রহমতের চাদরে আবৃত হই আজ থেকেই।

লেখক : তরুণ আলেম ও গণমাধ্যমকর্মী।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here