নোবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে ফেরার আকুলতা

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে মরণঘাতী করোনাভাইরাস। দিনে দিনে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ভাইরাসটিতে এরই মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে মারা গিয়েছে দুই লক্ষাধিক। বাংলাদেশে করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পুরো পৃথিবী সহ বাংলাদেশে চলছে লকডাউন। করোনা ভাইরাসের প্রকোপে প্রাণের নোবিপ্রবি অনির্দিষ্টকালের জন্যে বন্ধ রয়েছে। সব কিছু কত স্বাভাবিক ছিল।স্বাভাবিক ভাবেই চলছিল ক্লাস, পরীক্ষা সহ সবকিছু। (হঠাৎ তান্ডব) দুর্দিনের মহা প্রকোপে সব কিছু ভেস্তে দিলো।

ছুটির প্রথমদিকে সবার মনে উৎসাহ থাকলেও এখন তারা ছুটিকে মনে করছে কারাবন্দি।লকডাউনের এই দিনে সবাই এখন ঘরবন্দি।অফুরন্ত এই অবসরে কারো মনে নেই আনন্দ। নোবিপ্রবিয়ান রায়হান রাহীর সেই গানটি যেন আজ সত্যি হয়ে ধরা দিয়েছে।
‘আমার ধূলাবালি জমা বই
আমার বন্ধুরা সব কই
আমার ভাল্লাগেনা এই মিথ্যা শহর
রাতের আড়ালে রই।’

সবাই আবার ফিরে যেতে চায় প্রাণের ক্যাম্পাসে। সকালে লাল,সাদা বাসে করে ক্লাসে যাওয়া, শান্তিনিকেতন, নীলদিঘি, প্রশান্তি পার্কের আড্ডা, সেন্ট্রাল মাঠে খেলাধুলা করা ঘরবন্দি নোবিপ্রবিয়ানরা এখন বড্ড মিস করে।

সারাদিন ঘরবন্দি থাকা শিক্ষার্থীরা আবারও ফিরতে চায় প্রাণের ক্যাম্পাসে। তারা জানাচ্ছে তাদের স্বপ্নের ক্যাম্পাসে ফেরার আকুলতা। এমন কিছু শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে ফেরার ভাবনা তুলে ধরেছেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আশরাফুল ইসলাম সুমন।

পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্হাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান শুভ বলেন, সাধারণত ছুটি পেলে শিক্ষার্থীরা খুশি থাকে, কিন্তু এইভাবে বন্দি ছুটিতে আমি কিংবা কোন শিক্ষার্থীই খুশি থাকার কথা না। ক্যাম্পাসের টঙের অরুচিকর খাবার কিংবা মাস শেষে ফাঁকা পকেট খুবই ভালো এই বন্দি জীবন থেকে। খুব ইচ্ছে করে ক্যাম্পাসে গিয়ে বন্ধুবান্ধবের সাথে গানের আড্ডায় মেতে উঠতে, ইচ্ছে করে জুনিয়রদের নিয়ে চায়ের কাপে গল্পের ঝড় তুলতে জামাল মামার টঙে।

বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী এম ফাইয়াজ হাসান বলেন, আর ভাল্লাগে না এই কোরেন্টাইনময় জীবন।কবে পাবো ক্যাম্পাসের ভালোবাসা, ক্যাম্পাসের প্রতিটি স্মৃতি খুব মনে করাচ্ছে! হলের মজা, প্রশান্তি পার্কের মায়া, নীলদিঘীতে পার করা সময় গুলো,বন্ধুবান্ধব এর ফাইজলামি! ক্যাম্পাসের টং গুলো,চা এর সাথে টং এ বসে থাকার মধ্যেও যেই শান্তি, সেই শান্তি কবে পাবো? ক্যাম্পাসের প্রকৃতি খুব মিস করছি। করোনার এই লীলাখেলা আর কতদিন?

বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী জহিরুল ইসলাম রুবেল বলেন, প্রতিদিনের মতো লাল-সাদা বাসের ভিড়ের ভিতর দাড়িয়ে যাওয়া-আসায় নিজের অস্তিত্ব ছিলো।করোনার এই মহা দুর্দিনে বাসায় বসে নিজের মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ গুলোও মহা বিরক্ত। নোবিপ্রবি’র পকেট-গেট, ফাউন্টেন শহীদ মিনারের ফুল, প্রতিদিনের কোলাহল পূর্ণ সেই ক্যাফেটেরিয়া পার্ক কিংবা কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ সবই নিস্তব্ধতায় মোড়া। এখন কেউ আর লাইব্রেরি আর ক্লাসে নিঃশব্দে বা উচ্চ আওয়াজে বইয়ের পাতা উল্টায় না।বন্ধুদের আড্ডা কিংবা অডিটোরিয়ামে এখন হইচই হয় না। খুব শীঘ্রই সব আগের মত হয়ে উঠবে এই আশাতেই আমরা দিনগুলোকে দিনের মতোই মেনে চলছি।

শিক্ষা প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী জোভান আহমেদ নাঈম বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস আমাদের কাছে কতটা মূল্যবান প্রাপ্তি আমাদের জন্য। তার মধ্যে আমার কাছে অন্যতম হলো একটি বীর মুক্তিযোদ্ধা সাবেক স্পিকার মালেক উকিল হল, নোবিপ্রবি। সবচেয়ে বেশি আমি আমার হলে কাটানো সময়গুলো বেশি মিস করতেছি। সকালে ঘুম থেকে উঠেই সেই ব্যস্ত রুটিন প্রতিদিনের এখন আর হচ্ছে না। অনেক দিন হলো ডাইনিং সকালে একসাথে সব বন্ধুরা নাস্তা করি না। টিভি রুমে একসাথে বসে খেলা দেখা এবং সেই খেলায় আবার তর্ক যুদ্ধ সবচেয়ে বেশি মিস করি। হলের সেই গিটারে টুংটাং আয়োজন শুনিনা অনেক দিন হয়েছে। এখন অনেকটা আতঙ্কের মধ্যে দিন যাচ্ছে।আবার কি আমরা সবাই মিলিত হতে পারব প্রাণের ক্যাম্পাসে?

ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান আকরাম বলেন, চলতি বছরের ১লা জানুয়ারি ভার্সিটিতে পদার্পণ। আর এই অল্প সময়ের মধ্যে সোনালী ক্যাম্পাসটাকে খুব-ই আপন করে নিয়েছি। খেলাধুলা, ডিবেট, বন্ধুদের সাথে হতাশার মোড় আর শান্তিনিকেতনের আড্ডা, ক্যাফেটেরিয়ায় সিনিয়রদের পকেট ফাঁকা করে খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি করা, বাসে যাওয়ার সময় চিৎকার করে সম-স্বরে গান গাওয়া খুব বেশিই মিস করতেছি। বইগুলোতে ধূলো জমেছে অনেক, আর এর মাঝেই খুঁজে ফিরি ক্যাম্পাসের সেই সোনালী দিনগুলি। এখন শুধুই প্রতীক্ষা! কবে মিলিত হতে পারবো প্রিয়দের সাথে সেই প্রাণপ্রিয় ক্যাম্পাসে? কবে দেখা মিলবে সব পছন্দের মানুষের সাথে বিতর্কের মঞ্চে? কবে ফিরে যেতে পারবো সেই প্রাণের ক্যাম্পাসে? কবে ঘটবে এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান।

সিএসটিই বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস আলভী বলেন, ১৫দিনের বন্ধ পেয়ে অনেকদিন পর মায়ের হাতের রান্না খেতে পাওয়ার খুশি নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হয়েছিলাম। মহামারী করোনা ভাইরাসের প্রকোপের কারণে যখন সরকার বন্ধের সময় সীমা কিছুদিন পরপর বাড়াতে থাকে তখন থেকে ভেতরে একটা চাপা আতঙ্ক চেপে বসে।ক্যাম্পাস জীবনে হাপিয়ে উঠা এই আমি এখন মিস করি ভীষণভাবে স্যারের দেওয়া বোরিং লেকচারকেও,ক্যাম্পাসের সেন্ট্রাল ফিল্ডে হুট করে গোল হয়ে বসে আড্ডা দেওয়াকে,টং দোকানের চা খাওয়াকে,ফুসকায় ঝাল বেশি দিতে বলা মামাটাকেও,ক্যাম্পাস বাসে দাড়িয়ে থাকাকেও,।

প্রত্যেকবার স্মৃতিচারণে আতঙ্কে বুক কেপে উঠে আবার ফিরে যেতে পারবো তো সুস্থভাবে আমার ১০১একরের প্রাণের ক্যাম্পাসে? ফিরতে যদি পারিও থাকবে তো সব আগের মতো? আপনজন, বন্ধু বান্ধব,ক্যাম্পাসে আমার বিশাল পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে সুস্থ দেখতে চাওয়ার আতঙ্ক নিয়ে কাটে সময়। একটি করোনা মুক্ত সুস্থ পৃথিবী দেখার আকুল ইচ্ছা নিয়েই এখন দিনরাত কেটে যায়। কবে পাবো আমার প্রাণের ক্যাম্পাসে ফিরে যাওয়ার অনুমতি? কবে কাটবে পৃথিবীর উপর থেকে করোনার কালো মেঘ?

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here