নিপা ভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অভিনব পদ্ধতি অবলম্বন

দিনটি ছিল ইংরেজি নববর্ষের প্রথম দিন। চারদিকে ঘন কুয়াশা পৌষের গা হিম করা শীত। ফজরের সালাত আদায় করে গ্রামের মেঠোপথ ধরে হাঁটতে লাগলাম। মাটির রাস্তা। রাস্তার দু’পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে মেহগনি গাছ। হালকা বাতাস আসছে, সাথে মেহগনি গাছের শুকনো পাতা গুলো বৃষ্টির মত ঝর ঝর শব্দ করে পড়তে শুরু করলো। সব মিলিয়ে একটি মনমুগ্ধকর পরিবেশ ছিল।

হাঁটতে হাঁটতে একটি ফসলের মাঠের ভিতরে প্রবেশ করলাম। তারপর দু’পাশে সারিবদ্ধ কিছু খেজুর গাছ দেখলাম। বাংলার গ্রামীণ রাস্তার পাশে প্রকৃতিতে এ দৃশ্য যেন এখন কল্পনার খোরাক। হঠাৎ একটি খেজুর গাছের মাথায় চোখ আটকিয়ে গেল, দেখলাম রসের হাড়ি সাথে বাদুড় ঝুলছে। বেশ কৌতূহল নিয়ে খেজুর গাছটির নিচে গেলাম, লক্ষ্য করলাম গাছের মাথায় যেখান থেকে রস বের হয় সেখানে জাল দিয়ে আটকিয়ে রাখা হয়েছে। যাতে করে বাদুড় রস খেতে না পারে।

হঠাৎ পিছন থেকে কেউ একজন বলে উঠল কি মিয়া, কি দেখো! তার ডাক শুনে একটু ভয় পেয়ে গেলাম।

পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখি খেজুরের রস সংগ্রহকারী বাদল মিয়া। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম খেজুর গাছে আবার জাল দিয়েছেন কেন। আগে তো এই পদ্ধতি দেখিনি।

বদল মিয়া বলল, দেখবা কেমনে মিয়া! আগে কত মানুষ কাঁচা খেজুরের রস খেয়ে মারা গেছে। তখন তো আমরা জানতাম না যে, খেজুরের রসে বাদুড় মাধ্যমে নিপা ভাইরাস ছড়ায়। এই নিপা ভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য খেজু গাছের মাথায় জাল দেয়া যাতে বাদুড়ে খেজুর রস না খেতে পারে এবং ক্রেতা যেন এই ভাইরাসে আক্রান্ত না হয়।

বদল মিয়া বলেন, আমার বাড়িতে খেজুর রস কিনতে একদিন আগেও বায়না দিয়ে যেতো অনেকে। খাঁটি খেজুর গুড়ের ঘ্রাণ থাকত পুরো শীত মৌসুম। এখন আর খেজুরগাছ নেই তেমন। আর যা আছে তাতে রসও পড়ে অল্প।খেজুর রসে নিপা ভাইরাসের উপস্থিতি থাকতে পারে এমনটা ভেবে কেউ এখন আর কাঁচা রস শখ করেও খায় না। তাছাড়া খুব একটা পাওয়াও যায় না। যখন আমরা ছোট ছিলাম তখন শীতের সকাল মানেই খেজুরের রস খাওয়া। আর এখনকার বাচ্চারা খেজুর রসের স্বাদ কেমন তা ই জানে না। দিন দিন গাছ কমে যাওয়ায় রসও পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠেছে। তাছাড়া খেজুর রসে নিপা ভাইরাসের ঝুঁকি রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ দিন ধরে খেজুরগাছ কাটি। কয়েক বছর আগেও খেজুরগাছ কেটে শেষ করতে পারতাম না। এত পরিমানের গাছ ছিল। আর এখন মাত্র দুই দিন লাগে এই এলাকার সব গাছ কাটতে। এখন আর আগের মতো রস পড়ে না। তাছাড়া বাদুরের বেশ উৎপাত। অনেক গাছই এখন আর কাটা হয় না।

তারপরও ভেজালমুক্ত গুড় পাওয়ার আশায় এখনো অনেক দূর দূরান্ত থেকে মানুষ এসে আমার কাছ থেকে খেজুরের খাঁটি টাটকা গুড় সংগ্রহ করে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here