ধর্ষণের আসামির সঙ্গে কারাগারে ভুক্তভোগীর বিয়ে

আজ (১৯ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ফেনী জেলা কারাগারে দুই পক্ষের পরিবারের ২০ থেকে ৩০ সদস্যের উপস্থিতিতে ধর্ষণের অভিযোগ থেকে মুক্তি পেতে কারাগারেই ভুক্তভোগীকে বিয়ে করলেন ধর্ষণে অভিযুক্ত যুবক।

জানা গেছে, ৬ লাখ টাকা দেনমোহরে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী কাজী আবদুর রহিম তাদের বিয়ে পড়ান।

সোনাগাজী উপজেলার উত্তর চরদরবেশ গ্রামের স্থানীয় ইউপি সদস্য আবু সুফিয়ানের ছেলে জহিরুল ইসলাম জিয়ার সঙ্গে প্রতিবেশী কিশোরী বিবি জোহরার গভীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে উভয়ের সম্মতিতে তাদের শারীরিক সম্পর্কও হয়।

এ ঘটনা এলাকায় জানাজানি হলে দুই পরিবার তাদের বিয়ে দেওয়ার আলাপের উদ্যোগ নিচ্ছিল। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী মহল ঘটনা মীমাংসার সুযোগে টাকা দাবি করেছিল জিয়ার বাবার কাছে। তিনি টাকা দিতে রাজি না হলে গত ২৭মে মেয়েটির পরিবারকে প্ররোচনা দিয়ে থানায় জিয়ার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা দায়ের করা হয়। সে মামলায় পুলিশ জিয়াকে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

সবশেষ মামলাটি হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। গত ১ নভেম্বর বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বেঞ্চ আদেশ দেয়, জিয়া ওই মেয়েকে বিয়ে করলে জামিনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

আদালত আদেশে উল্লেখ করেন, উভয়পক্ষ সম্মত থাকলে ফেনী জেলা কারাগার কর্তৃপক্ষ আদেশ প্রাপ্তির ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করবে এবং বিয়ে সংক্রান্ত প্রতিবেদন হাইকোর্টকে অবহিত করবে। বিয়ে রেজিস্ট্রি হয়েছে কারা কর্তৃপক্ষের এমন প্রতিবেদন হাইকোর্টে জমা হলে আদালত জামিন আদেশ দেবেন।

ফেনী জেলা কারাগারের জেল সুপার আনোয়ারুল করিম জানান, হাইকোর্টের নির্দেশনা পেয়ে দুই পরিবারের মধ্যে আলোচনাক্রমে তাদের বিয়ের তারিখ ধার্য করা হয়েছিল। সে মোতাবেক আজ কনেসহ দুই পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে বিয়ে পড়ানো হয়েছে। এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন হাইকোর্টে পাঠানো হবে।

বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মনিরুজ্জামান বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনা মতে জেল সুপারের তত্ত্বাবধানে আইনজীবী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং দুই পরিবারের লোকজন উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, এটি নতুন একটি অভিজ্ঞতা।

মামলার বিবাদী পক্ষের আইনজীবী ফারুক আলমগীর বলেন, গত ১ নভেম্বর আদালত বিয়ের শর্তে আমার মক্কেলকে জামিন দেওয়ার অভিমত ব্যক্ত করে এ আদেশ দেন। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

বাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনা মোতাবেক ফেনী কারাগারের জেলারের তত্ত্বাবধানে দুই পরিবারের উপস্থিতিতে আজকে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা ন্যায় বিচার পেয়েছি বলে মতামত ব্যক্ত করেন তিনি।

নানা ঘাত প্রতিঘাতের পর প্রেমের এমন পরিণতিতে কনে জোহরা নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, এমন আয়োজনে এবং হাইকোর্টের রায়ে আমি খুশি। দ্রুত স্বামীর মুক্তি দেবার অনুরোধ জানান তিনি।

বিয়ে পড়ানো শেষে কারাগারে উপস্থিত সকলকে মিষ্টিমুখ করানো হয়, নব দম্পতির সুখ শান্তি কামনায় মোনাজাত করা হয়। ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে ফেনীতে এটি একটি নজিরবিহীন ঘটনা বলছেন আইনজীবীরা।

তবে এ ধরনের ঘটনা ধর্ষণকে আরও উৎসাহিত করতে পারে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ নারী মুক্তি কেন্দ্র ফেনীর আহ্বায়ক জোবেদা আক্তার কচি। তিনি বলেন, ধর্ষকরা মনে করতে পারে বিয়ে করলেই তারা পার পেয়ে যাবে। তবে আদালত কোন দৃষ্টিকোণ থেকে রায়টি দিয়েছেন সেটিও বিবেচ্য বিষয়।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here