কথায় বলে দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পোষা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) পুরোনো একাডেমিক ভবনে গেলে এই প্রবাদটির সঙ্গে মিল পাওয়া যাবে। সেখানে যত্নে বেড়ে উঠছে ৫২টি বিভিন্ন প্রজাতির বিষধর সাপ। নিয়ম করে খাবারও দেওয়া হয় সাপগুলোকে। বাচ্চা সাপকে হাতে ধরে খাইয়ে দেওয়া হয়। এভাবে দুধ–কলা দিয়ে সাপ পোষার মূল উদ্দেশ্য অ্যান্টিভেনম অর্থাৎ সাপে কাটার প্রতিষেধক তৈরি করা।

বিশ্বের অবহেলাজনিত অন্যতম রোগ কিংবা মৃত্যুর মধ্যে সাপে কাটাকে বিবেচনায় নিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এর অংশ হিসেবে গত মার্চে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সম্মেলনে সদস্য দেশগুলোকে সাপে কাটা প্রতিরোধের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশে সাপের বিষের প্রতিষেধক তৈরি করার পরিকল্পনা নেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় আট কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি এই অ্যান্টিভেনম তৈরির প্রকল্পটি চলছে। চমেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগ মূলত এই কর্মসূচির দায়িত্ব পায়। তাদের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে রয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর অ্যাডভান্স মেন্টর ট্রপিক্যাল মেডিসিন, মেডিসিন টক্সিকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশ এবং জার্মানির গ্যেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা।

এই প্রকল্পে মুখ্য গবেষকের দায়িত্বে রয়েছেন চমেক মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক অনিরুদ্ধ ঘোষ। গত বছরের মার্চ মাস থেকে সাপ সংগ্রহ করার কাজ শুরু হয়। অনিরুদ্ধ ঘোষ প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে এখানে ১৮টি পূর্ণ বয়স্ক সাপ রয়েছে। চার প্রজাতির এই সাপের মধ্যে গোখরার একটি প্রজাতির (পদ্মগোখরা) ৩৪টি বাচ্চাও রয়েছে।

চমেক পুরোনো একাডেমিক ভবনের নিচতলার একটি মিলনায়তনের একপাশ সাপের ঘর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রাপ্তবয়স্ক ১৮টি সাপের মধ্যে দুই প্রজাতির ১০টি গোখরা, একটি কালকেউটে, দুটি শঙ্খিনী ও তিনটি সবুজ বোড়া রয়েছে।

এখানকার আবাসনটি খুবই সুরক্ষিত। সাপের কাছে পৌঁছাতে চারটি কাঠ ও কাচের দরজা পার হতে হয়। তিনটি দরজা পার হওয়ার পর একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর। কক্ষের পাশে ছোট একটি কাচঘেরা কক্ষে বড় হচ্ছে কিছু ইঁদুর। ইঁদুরের প্রজননও হচ্ছে এখানে। সাপের খাবারের জন্য এগুলো করা হচ্ছে।

এরপর আরেকটি কাচের দরজা পার হলে সাপের মূল আবাসন। ঢাকনাযুক্ত প্লাস্টিকের বড় বড় কিছু বাক্সে সাপগুলো রাখা। প্রতিটি বাক্সে একটি করে সাপ। কাছাকাছি যেতেই একটি গোখরা ফণা তুলে ফোঁস করে ওঠে।

সাপের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে রয়েছেন মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি বলেন, সাপগুলোকে মাঝেমধ্যে বাক্স থেকে বের করে বড় খাঁচায় রাখা হয়, যাতে আলো–বাতাস পায়। সবকিছু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী হচ্ছে।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ জানালেন, এখানে ডিম থেকে বাচ্চা ফোটায় একটি গোখরা সাপ। ওই বাচ্চাগুলোকে হাতে তুলে নিয়ে খাইয়ে দিতে হয়। এতে ঝুঁকিও রয়েছে। ইঁদুর ছাড়াও গিরগিটি এবং অবিষধর ঢোঁড়া সাপ খাবার হিসেবে দেওয়া হয়।

সাপের প্রতিপালনে রয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা তিন যুবক। তাঁদের একজন মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমার বিষয় ছিল সাপ। তাই এই কাজটি করতে ভালো লাগছে। যদি সাপের প্রতিষেধকটি তৈরি করা যায় তাহলে অনেক ভালো লাগবে। খুব শিগগিরই বিষ সংগ্রহ করা হবে।’

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here