তারুণ্যের ভাবনায় স্বাধীনতা

স্বাধীনতা বাঙ্গালির মুক্তির সনদ৷ এই স্বাধীনতা অর্জন করার মধ্য দিয়েই তরুণদের তারুন্যের স্ফুলিঙ্গ প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল সেদিন৷ পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে দুর্বার গতিতে তেজী, তেজস্বী বাংলার সন্তানরা অধিকার করেছিল এই স্বাধীনতা৷ বর্তমানে তরুণরাও এখন অনেক সচেতন। দেশ প্রেমে,মননে সব দিক দিয়েই তারা এগিয়ে। চলছে স্বাধীনতার মাস। কি ভাবছেন আমাদের তরুণরা?
তরুণদের কাছে এই স্বাধীনতা কতটুকু প্রেরণার? এই স্বাধীনতার সংজ্ঞাটা কী? স্বাধীনতার বাস্তবায়ন? এসব হরেক প্রশ্নের উত্তর খুজতে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন তরুণের সাথে স্টুডেন্ট জার্নালের আলাপ চারিতায় উঠে এসেছে স্বাধীনতা নিয়ে তাদের চিন্তা-ভাবনা।

আব্দুল কাদের

আব্দুল কাদের
সভাপতি
বেগম রোকেয়া ইউনিভার্সিটি ডিবেট ফোরাম (বিআরইউডিএফ)

 

প্রিয় মাতৃভূমি, প্রিয় স্বাধীনতা সেতো এক সাগর রক্ত আর ৩০ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের প্রতিদান। তাঁদের একনিষ্ঠ ত্যাগ, জিবন বলিদান ও শাহাদাতের ওপর নির্মিত হয়েছে আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। আজিবন আমরা তাঁদের কাছে ঋণী।

কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এই দেশে আজও সম্ভ্রমহানি বন্ধ হয়নি, পত্রিকা খুললে দেখা যায় শিশু বাচ্চা থেকে বৃদ্ধা মহিলা কেউ মুক্তি পাচ্ছেনা মানুষরূপী হায়েনার হাত থেকে । আজও সড়কে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মিছিল দেখতে হয়। আজও মানুষ বৈষম্যের শিকার নানানভাবে বিভিন্নক্ষেত্রে। বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এই স্বাধীন হয়েছে যার অন্যতম উদ্যেশ্য ছিলো বৈষম্যহীন একটি রাষ্ট্রগঠন। সেই রাষ্ট্র গঠনের ভূমিকায় তরুণ প্রজন্মকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। সকল বিভেদের অবসান ঘটিয়ে সবাইকে এক প্লাটফর্মে আসতে হবে। স্বাধীনতার পরিপূর্ণ সূফল পেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে জাতি, দলমত ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একটি সুখী, সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন ও একটি আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে কাজ করতে হবে।

 

 সুমাইয়া সীমা

সুমাইয়া সীমা
অর্থনীতি বিভাগ

আলো আসবেই!

আমরা স্বাধীন। এবং এই স্বাধীনতা এমনি এমনি আসে নি। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার ফলস্বরুপ এই স্বাধীনতা। আমাদের দেশের বর্তমানে তরুণদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার সেই আন্দোলন এবং দেশ স্বাধীন হবার জন্য যে উদ্দেশ্য ছিলো তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করার সময়। কারণ স্বাধীনতা সংগ্রামের কারণে আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি কিন্তু আমরা স্ব স্ব ক্ষেত্রে স্বাধীন হতে পারিনি।স্বাধীনতার মূলমন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে দেশের প্রতিটি জিনিস নিয়ে ভাবতে হবে। এবং একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে প্রত্যেক নাগরিকের দ্বায়িত্ব কর্তব্য এবং অধিকার সম্পর্কে অবগত থাকা জরুরি। এবং যখন প্রত্যেকেই তার অধিকার, কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হবে ঠিক তখনই দেশ বদলানো সহজ। তখনই দেশ, জাতি, সমাজ তথা প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসবে। আর এই কাজটি করতে হবে তরুণদের। বিপুল সংখ্যক তরুন যখন সোচ্চার হবে দেশ তখন পাল্টাতে সময় লাগবে না।এবং স্বাধীনতার মূল উদ্দেশ্য বাস্তব রুপ ধারণ করবে। স্বাধীনতার সংগ্রামের মত করে উদ্দেপিত হয়ে আবার জেগে উঠুক তরুণ সমাজ। আলো আসবেই।

মুন-ইমু

মুন-ইমু
বাংলা বিভাগ

আমরা কী সত্যিকার অর্থে বিজয়ী হতে পেরেছি!

আমরা বর্তমান প্রজন্ম নিজের চোখে মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েই একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হওয়া সৌভাগ্য অর্জন করেছি। চোখে অদেখা ছিলো সাধারণ বাঙালির উপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দমন, পীড়ন, শোষন, নির্যাতন। শত প্রাণের বলিদান, হাজারো অসহায় মা-বোনের সম্ভ্রমহানি, শত আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত শরীরের বিনিময়ে পেয়েছি একটি পতাকা, একটি রাষ্ট্র, একটি ভুখন্ড। আজ যখন আমি আমার অন্তরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করি, ঠিক তখনি দেখি ২৬ মার্চ বিশেষ দিনগুলোতে তরুণ সমাজ যেনো আড্ডা, মাস্তি, ছুটি কাটানো ঘুরে বেড়ানোর দিন হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত।ভীষণ খারাপ লাগে তখন।মনে হয় এই জন্যেই কী আমার ভাই, বোন, মায়েরা তাদের তাজা রক্ত ঝরিয়েছিলো! স্বাধীন হওয়ার এত বছর পর এখনো ভাবি, আমরা কী সত্যিকার অর্থে বিজয়ী হতে পেরেছি! এখনো অনাহারে, অর্ধাহারে ধুঁকে ধুঁকে মরছে শত সহস্র বাংলাদেশি।

এখনো বস্ত্রের অভাবে লজ্জা নিবারণ করতে পাররছে না অনেকেই।এখনো হাজারো বাংলাদেশি ফুটপাতে খোলা আকাশের নিচে  মানবেতর জীবন যাপন করছে! আমাদের শিক্ষাঙ্গন আজ কলুষিত কুরাজনীতি, সন্ত্রাসী, দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও নানারকম অপরাধের কালো থাবায়।শিক্ষকের কাছে শিক্ষার্থী নিরাপদ নয়, চিকিৎসকের কাছে রোগী সঠিক চিকিৎসা পায় না, রাজনীতি যেনো আজ সুস্থ মস্তিষ্কের নয়। ভেতরে অগণিত প্রশ্ন!

তারপরেও আমি বাংলাদেশি, জন্মস্থান বাংলাদেশ।এই দেশের প্রতিটি মাটির কণা আমার শরীরে লেগে আছে, এই মাটির উপর ভর করে আমি হাঁটতে শিখেছি। তৃষ্ণায় পিপাসার্ত হলে দেশের জল পান করেছি এবং করছি। আমার এই প্রাণপ্রিয় দেশটাকে যতই বহিরাগতরা ভৎসনা করুক, ঘূণা করুক, তলাবিহীন ঝুড়ি বলুক, আমরা থেমে যাবো না তাদের কটুবাক্যে। এগিয়ে যাবো দৃঢ় পদক্ষেপে প্রতিটা বলুকণা রক্ষা করার প্রত্যয়ে। আমি আশাবাদী ভীষণ রকম আশাবাদী। গ্রেনেড নয়, বোমা নয়, আমদের হাতে ন্যায়নীতি আর সততার অস্ত্র তুলে দাও, যা দিয়ে দেশটাকে বিশুদ্ধ করতে চাই। পৃথিবীর বুকে একটি মর্যাদাপূর্ণ দেশ হিসেবে দেখতে চাই। আমার বাংলাদেশ হবে বসবাসযোগ্য আবাসভূমি। পরবর্তী প্রজন্ম যেনো বলতে পারে, সার্থক জন্ম আমার জন্মেছি এই দেশে। পরিশেষে বলতে চাই এই দেশ আমার, আপনার, সকলের। তাই এখনি এগিয়ে আসুন হাতে হাত রেখে দেশটাকে শুদ্ধতার সাথে উন্নতির চরমশিখরে নিয়ে যাই।।

তারিকুল ইসলাম পিয়াস

তারিকুল ইসলাম পিয়াস
লোক প্রশাসন বিভাগ

স্বাধীনতা কেবল তরুণদের জন্য নয়,সকলের

স্বাধীনতা কেবল তরুণদের জন্য নয়,সকলের। তবে স্বাধীনতা শব্দটির সাথে একটি বাক্য বহুল প্রচলিত -স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন। সেই নির্মম বাস্তবতা আজও দেখা যায়। যখন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলা হয় কিংবা নারীদের প্রতি শ্লীলতাহানির খবর দৈনন্দিন পত্রিকায় খুঁজে পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে নাগরিকদের বিমুখ হয়ে যাওয়াও রাজনৈতিক অধিকার ও স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তবে এর মাঝেও আশার দিক হলো বৈষম্য কমছে, নারী পুরুষ সমান তালে এগিয়ে যাচ্ছে।যা প্রমাণ করে লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণে প্রাপ্য স্বাধীনতাটুকু পেতে শুরু করেছে দেশের নারীসমাজ। সকল শ্রেণীর মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে প্রাপ্য স্বাধীনতা রাষ্ট্র তার প্রত্যেক নাগরিককে প্রদান করবে। এটাই প্রত্যাশা।

হাসিবুর রহমান প্রান্ত

হাসিবুর রহমান প্রান্ত
মার্কেটিং বিভাগ

কি লাভ হলো এ স্বাধীনতা অর্জন করে?

আমার চোখে স্বাধীনতা। স্বাধীনতা শব্দটি উচ্চারন করলে পাশাপাশি অপর একটি শব্দ চলে আসে তা হলো বঙ্গবন্ধু। স্বাধীনতা এবং বঙ্গবন্ধু একই ধাতব মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। আমি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ দেখিনি তবে অনেক গল্প শুনেছি। অনেক ইতিহাস পড়েছি। এটি ছিল বাঙালী জাতীর অধিকার আদায়ের লড়াই। সবার আন্তরিক প্রচেষ্টা, দৈহিক ও মানসিক লড়াই শেষে তবেই স্বাধীনতা শব্দটি আমরা পেয়েছি। এ সব কিছুই আমাকে অনুপ্রাণিত করে দেশের জন্য ভালো কিছু করতে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট চিন্তা করলে আমার ভাবনা গুলোতে ছেদ পড়ে। দেশের যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গুলো রয়েছে সেখানে একজন সাধারন মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা সঠিক ভাবে পায়না। সব জায়গায় দূর্নীতি, অনিয়ম আর স্বজনপ্রীতি। রাষ্ট্রকে কিছু ক্ষমতা লিপ্সু মানুষ ব্যাক্তি মালিকানা করে রেখেছে। সার্বিক বিষয় গুলো যখন চিন্তা করি তখন মনে হয় কি লাভ হলো এ স্বাধীনতা অর্জন করে? কি পেলাম এ স্বাধীনতা থেকে? এইতো কিছুদিন আগেন ঘটনা- দূর্নীতি দমন কমিশনের মিথ্যা মামলায় একজন নিরপরাধ মানুষ দীর্ঘদিন কারাভোগ করলেন। একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যদি এই অমানবিক কাজটি করতে পারে তাহলে না জানি দেশের আনাচে কানাচে কত সহস্র মানুষের সাথে এমন অনাচার করা হচ্ছে যা আমাদের চক্ষু অগচরে।

আমাদের দেশে এক শ্রেনির রাজনীতিবীদ সর্বক্ষণ বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধু বলে চিৎকার করে। অন্যসময় তারাই সেই নাম ভাঙ্গিয়ে রাষ্ট্রের সম্পদ লুট করে। বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীনতার জন্য আন্দলন করেছিলেন। যে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন সে স্বাধীনতা আমার আজও অর্জন করতে পারিনি। তাই তরুনদের মধ্যে সত্যিকার স্বাধীনতার চেতনার বীজ বপন করতে হলে রাষ্ট্রের মানুষকে আগে সত্যিকার স্বাধীনতার স্বাদ দিতে হবে তবেই তারা স্বাধীনতার চেতনায় নিজেকে গড়ে তুলতে পারবে। একটি প্রবাদ আছে- আগে দর্শনধারী পরে গুন বিচারি। তরুনরা দেখছে বর্তমানে কোথায় কি হচ্ছে আর সেগুলোই শিখছে। অতীতে কি হয়েছে তা সকলের বিবেচ্য নাও হতে পারে। তাই আমার মনে হয় স্বাধীনতা শব্দটির প্রকৃত তাৎপর্য বুঝে তারপর রাষ্ট্র পরিচালনা করা উচিত। তবেই আমরা তরুনদের হাত ধরে স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে পারবো।

 মুশফিক খান আকাশ

মুশফিক খান আকাশ
লোক-প্রশাসন বিভাগ

তারুণ্য আর স্বাধীনতা একই সূত্রে গাথা

তারুণ্য আর স্বাধীনতা একই সূত্রে গাথা। তারুণ্য আর স্বাধীনতা দুটোতেই আছে বাধ না মানা বিজয় উল্লাসের দীপ্ততা। যা আলোর প্রদীপ হয়ে বহুদূর যাওয়ার সাহস জোগায়। স্বাধীনতা বাংলার মানুষকে এনে দিয়েছে প্রাণ খুলে বাচার অধিকার, মুখ ফুটে কথা বলার অধিকার ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অদম্য সাহস। যা যুগে যুগে বাংলার তরুণদের প্রভাবিত করবে ন্যায় ও সত্যের পথে লড়াই করার। আজকের এই স্বাধীনতা লাখো শহীদের তাজা রক্তের দান। যার একটা প্রধান অংশ ছিল তরুণ সমাজ। যারা বাঁধন হারা হয়ে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পরে ছিনিয়ে এনেছিলো বাংলা মায়ের সম্মান, সার্বভৌমত্ব। আজকের এই আধুনিক দিনে যখন সারা বিশ্ব তাদের সাফল্য ও প্রতিপত্তি দেখাতে উন্মুখ নতুন নতুন আবিষ্কারে ছিনিয়ে নিচ্ছে গৌরব, তখন এই স্বাধীনতাই শক্তি যোগায়, নাড়া দেয় তারুণ্যের প্রাণে নতুন কিছু করার অনুপ্রেরণা যোগায়।যার ফলে আজ বাংলাদেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আসরে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ পাচ্ছে। আমার চোখে স্বাধীনতা মানেই তারুণ্য যা প্রভাতীর কাণ্ডারী হয়ে যুগে যুগে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা যোগাবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here