অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের জয়কে ম্যাচ শুরুর আগে হয়তো অনেকেই স্বপ্নেরও বাইরে রাখতেন। প্রস্তুতি ম্যাচে বাংলাদেশের ব্যাটিং ধস সেই সংশয় আরও বাড়িয়েছিল। কিন্তু একজন বিশ্বাস করেছিলেন-অস্ট্রেলিয়াকে হারানো সম্ভব। সেই বিশ্বাসের নাম মেহেদী হাসান মিরাজ। প্রস্তুতি ম্যাচে ব্যাট হাতে সেঞ্চুরি করে যে আত্মবিশ্বাসের আগুন জ্বেলেছিলেন, ডারউইন টেস্টে সেটিই ছড়িয়ে দিলেন ব্যাট ও বল হাতে। দল পেল অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে আজ ইতিহাসের প্রথম টেস্ট জয়। ৯ উইকেটে জয়ের ম্যাচে মিরাজ নিজে উঠে গেলেন অনন্য এক উচ্চতায়!
ডারউইন টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৬৫ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলার পর বল হাতে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে একের পর এক আঘাত হেনেছেন মিরাজ। চতুর্থ দিনের প্রথম সেশনেই তার হাতে পতন হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার তিন উইকেট। প্যাট কামিন্সকে সাদমান ইসলামের ক্যাচে পরিণত করার মধ্য দিয়ে পূর্ণ করেছেন টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ১০০ উইকেটের মাইলফলক। এর আগে তৃতীয় দিনে নিয়েছিলেন একটি উইকেট।
কামিন্সের পাশাপাশি দ্বিতীয় ইনিংসে মিরাজের শিকার হয়েছেন স্টিভ স্মিথ, অ্যালেক্স ক্যারি ও বিউ ওয়েবস্টার। শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে তাঁর শিকার পাঁচ উইকেট। ব্যাট হাতে ৬৫, বল হাতে পাঁচ উইকেট-ডারউইনের ঐতিহাসিক জয়ে মিরাজ ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কারিগর।
এই পারফরম্যান্সের মধ্য দিয়েই বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে অনন্য এক ডাবল পূর্ণ করেছেন মিরাজ। ৩২তম ম্যাচে তার রান দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৩৬। সঙ্গে ১০০ উইকেট। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ১ হাজার রান ও ১০০ উইকেটের ডাবল গড়লেন তিনি।
বাংলাদেশের হয়ে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ১০০ উইকেটের মাইলফলক অবশ্য মিরাজের আগে স্পর্শ করেছেন তাইজুল ইসলাম। এবার তার পাশে বসেছেন মিরাজ। তবে ১ হাজার রান ও ১০০ উইকেটের ডাবলটি তাকে নিয়ে গেছে আরও বিশেষ এক তালিকায়। এই কীর্তি গড়া মাত্র পঞ্চম ক্রিকেটার তিনি। তাঁর আগে এই তালিকায় ছিলেন রবীন্দ্র জাদেজা, রবিচন্দ্রন অশ্বিন, প্যাট কামিন্স ও ক্রিস ওকস।
তবে ব্যক্তিগত রেকর্ডের চেয়েও মিরাজের কাছে বড় দলের সাফল্য। ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারানোর পর পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি জানালেন, এই জয় হঠাৎ করে আসেনি। বরং বিশ্বাসের বীজ অনেক আগেই রোপণ করা হয়েছিল।

মিরাজ বলেন, ‘আমরা চমৎকার ক্রিকেট খেলেছি। অনেক দিন পর আমরা এখানে এলাম। দলের অসাধারণ পারফরম্যান্স ছিল, যা আমাদের চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।’
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে যাওয়ার আগে প্রস্তুতি ম্যাচে মিরাজের ব্যাটে এসেছিল সেঞ্চুরি। কিন্তু পরের ইনিংসে বাংলাদেশের দলীয় ব্যাটিং ভেঙে পড়ে মাত্র ৫৪ রানে। এমন পরিস্থিতিতেও আত্মবিশ্বাস হারাননি তিনি। বরং দলের ভেতরে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর বিশ্বাসটা তখনই তৈরি হয়েছিল বলে মনে করেন মিরাজ।
তিনি বলেন, ‘আমাদের সেই বিশ্বাসটা ছিল। অস্ট্রেলিয়া বিশ্বমানের দল এবং তাদের দলে অনেক ভালো খেলোয়াড় রয়েছে। আমরা জানতাম যদি ওদের হারাতে পারি, তবে তা আমাদের দেশের জন্য দারুণ কিছু হবে। বার্তা একটাই ছিল, আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে, তা না হলে এটা সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিতে কীভাবে পারফর্ম করতে হবে তা নিয়ে ভাবতে হবে।’
ডারউইনে সেই বিশ্বাসই যেন একে একে রূপ নিয়েছে বাস্তবে। প্রথমে হাসান মাহমুদের আগুনঝরা বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেওয়া। এরপর বাংলাদেশের ব্যাটারদের হাতে ২২৮ রানের লিড। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও মিরাজের স্পিনে বারবার থমকে যাওয়া। শেষে মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য নিয়ে নেমে বাংলাদেশ ১৪.২ ওভারেই জয় নিশ্চিত করেছে।
এই পুরো যাত্রায় মিরাজের নিজের পারফরম্যান্সও ছিল দলের গল্পের সঙ্গে মিশে থাকা। ব্যাট হাতে তিনি যখন ক্রিজে ছিলেন, তখন নিচের সারির ব্যাটারদের সঙ্গে জুটি গড়ে দলকে বড় সংগ্রহ এনে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। মিরাজ মনে করেন, তাঁর ব্যক্তিগত রান এসেছে সতীর্থদের অবদানের ওপর ভর করেই।
তিনি বলেন, ‘আমরা সঠিক সময়ে ভালো ব্যাটিং ও বোলিং করেছি। প্রথম ইনিংসে তানজিদ তামিম যেভাবে ব্যাট করেছে, শান্ত ও মুমিনুল খুব ভালো করেছে, আর তারপর নিচের সারির ব্যাটারদের সাথে চমৎকার জুটি আমাকে সাহায্য করেছে। ওরা আউট হয়ে গেলে আমি রানগুলো করতে পারতাম না। ওরা ক্রিজে টিকে ছিল বলেই আমি সেটা করতে পেরেছি। আমি ওদের বলেছিলাম, ‘তোমার সামনে কে বল করছে তা নিয়ে ভাববে না।’
মিরাজের কথায় শুধু নিজের ব্যাটিংয়ের গল্প নেই, আছে দলের মানসিকতার ছবিও। অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে খেলতে গিয়ে প্রতিপক্ষের নাম কিংবা র্যাঙ্কিং নিয়ে না ভেবে নিজেদের কাজটুকু করার যে মানসিকতা বাংলাদেশ দেখিয়েছে, ডারউইনের জয় তারই ফল।
বিশেষ করে টেলএন্ডারদের ভূমিকা মিরাজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বড় দলের বিপক্ষে নিচের সারির ব্যাটাররা কতটা মূল্যবান হয়ে উঠতে পারেন, ডারউইনেই তার প্রমাণ মিলেছে। মিরাজের ৬৫ রানের ইনিংসটিও এসেছে এমন এক সময়ে, যখন প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণকে সামলাতে তাঁর পাশে প্রয়োজন ছিল সঙ্গীর। সেই সঙ্গ পেয়েই তিনি নিজের কাজটা শেষ করেছেন।
আর বল হাতে? সেখানেই মিরাজের আসল ঝড়। অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটারকে ফিরিয়ে তিনি নিশ্চিত করেছেন, বাংলাদেশের সামনে যেন বড় কোনো বাধা না থাকে। স্মিথ, ক্যারি, ওয়েবস্টার, কামিন্স-অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ নামগুলো তার শিকার।
ডারউইনের জয় তাই মিরাজের জন্য একই সঙ্গে দলীয় ইতিহাস ও ব্যক্তিগত ইতিহাসের দিন। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ১০০ উইকেট ও ১ হাজার রানের বিরল ডাবল, সঙ্গে ম্যাচে ব্যাট ও বল হাতে কার্যকর অবদান-সব মিলিয়ে দিনটি তার ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকল।
ইতিহাস গড়ার গল্পে মিরাজের জন্য একটি আলাদা পৃষ্ঠা থাকবেই। কারণ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ যখন বিশ্বাস করতে শিখল যে অসম্ভবও সম্ভব, তখন সেই বিশ্বাসের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিলেন তিনিই-ব্যাট হাতে ৬৫, বল হাতে পাঁচ উইকেট, আর ক্যারিয়ারের খাতায় বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ১০০ উইকেট ও ১ হাজার রানের অনন্য স্বাক্ষর!





