খেজুর এলো কেমন করে

দীর্ঘ ১১ মাস অপেক্ষার প্রহর শেষে আবার এসেছে সংযমের মাস পবিত্র রমজান। এ বছর মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে রোজা শুরু হয়েছে গত মঙ্গলবার থেকে। বাংলাদেশসহ এশীয় অঞ্চলে বুধবার থেকে। পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে মহিমান্বিত এ মাসজুড়ে সিয়াম সাধনা বা রোজা পালন করবেন ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা।

দিনের বেলা পানিপানসহ সব ধরনের খাদ্যগ্রহণ থেকে বিরত থাকবেন রোজাদাররা। মুখের ভাষা, চোখের নজর সংযত রাখবেন; এড়িয়ে চলবেন শারীরিক সম্পর্কের মতো বিষয়গুলো। দিনব্যাপী রোজার শুরু হয় সেহরি খাওয়ার মাধ্যমে। শেষ হয় ইফতার দিয়ে। সূর্যাস্তের সময় ইফতারে প্রায় সবাই খেজুর খেয়ে থাকেন রোজাদারেরা।

বহু বছর ধরে এটি হয়ে উঠেছে ইফতারির অন্যতম উপাদান। খেজুর না থাকলে যেন মনে হয়, কিছু একটা অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে! ইফতারিতে খেজুর চাইই চাই! শুধু মনের স্বস্তিই নয়, এর রয়েছে প্রচুর পুষ্টিগুণ। খেজুর ভিটামিন, মিনারেল, ফাইবারে ভরপুর। এর মধ্যে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা বিভিন্ন রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়।

বৈজ্ঞানিক নাম ফিনিক্স ডাকটিলিফেরা। বাংলায় খেজুর। স্বাদ ও খাদ্যগুণ বিচারে কখনো কখনো ডাকা হয় ‘মিষ্টির রুটি’ নামে। কেউবা আবার বলেন ‘গরিবের পিঠা’। বৈজ্ঞানিক নামটি এসেছে প্রাচীন গ্রিস থেকে। জর্ডান উপত্যকা ও ভূমধ্যসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলটি খেজুর গাছে পূর্ণ ছিল।

গ্রিক পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী অমর ফিনিক্সের সাথে মিলিয়ে খেজুরের বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হয়। ফিনিক্স পাখি হচ্ছে অমর, যে কিনা সূর্যের শিখায় পুড়ে ছাই হয় এবং নিজের ছাই থেকে পুনর্বার জন্মগ্রহণ করে। খেজুরের পুষ্টিগুণ প্রমাণ করতেই এভাবে তুলনা করা হয় ফিনিক্সের সঙ্গে। আর এর চমৎকার খাদ্যগুণের কারণেই রমজান মাসে খেজুরের চাহিদা ও সরবরাহ আকাশচুম্বী হয় বিশ্বব্যাপী।

খেজুরের উচ্চ পুষ্টিমান অবাক করার মতো। এতে রয়েছে উচ্চমাত্রায় ফ্রুক্টোজ। এটি এক ধরনের প্রাকৃতিক চিনি যা শুধু ফলের মধ্যেই পাওয়া যায়। এ ছাড়া শর্করা, ডায়েটরি ফাইবার, প্রোটিন, খনিজ এবং ভিটামিন বি কমপ্লেক্স সমৃদ্ধ। এতে প্রায় ৭০% কার্বোহাইড্রেট রয়েছে এবং এতে ক্যালসিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম এবং পটাসিয়ামও পাওয়া যায়।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে যে খেজুর অত্যন্ত পুষ্টিকর এবং এর অনেকগুলো স্বাস্থ্য সুবিধা রয়েছে। তাদের মধ্যে ফাইটোকেমিক্যাল রয়েছে যা কোলেস্টেরল কমিয়ে ডায়াবেটিস, ক্যান্সার এবং কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে বলে মনে করা হয়।

খেজুর শরীরে প্রচুর শক্তি জোগায়, বিশেষ করে দিনভর রোজা রাখার পর এটি খাওয়া খুবই উপকারী। খেঁজুর বিভিন্ন আকার, আকৃতি ও রঙের হয়ে থাকে। কিন্তু জানেন কি, আপনার বাড়িতে থাকা খেজুরটি কোথা থেকে আসছে? জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য মোতাবেক, প্রতি বছর বিশ্বে অন্তত ৯০ লাখ মেট্রিক টন খেজুর উৎপাদিত হয়।

সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যের মতো উষ্ণ ও গ্রীষ্মপ্রধান এলাকায় এর উৎপাদন ভালো হয়। সবচেয়ে বেশি খেজুর উৎপাদিত হয় মিসরে। বিশ্বের প্রতি পাঁচটি খেজুরের একটি বা প্রায় ১৮ শতাংশ খেজুরই আসে আফ্রিকা-মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যবর্তী এই দেশ থেকে। এরপরই আছে সৌদি আরবের অবস্থান ১৭ শতাংশ এবং তৃতীয় অবস্থানে ইরান ১৫ শতাংশ।

সুদীর্ঘকাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রধানত মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশে জনসাধারণের কাছে খেজুর প্রধান উপাদেয় খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে, খেজুরের চাষাবাদ কিংবা খেজুর গাছের উৎপত্তি সম্বন্ধে সঠিক কোনো তথ্য জানা যায়নি। ধারণা করা হয় যে, পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী দেশগুলোয় সর্বপ্রথম এর চাষাবাদ হয়েছিল।

সম্ভবত প্রাচীনকাল থেকেই মেসোপটেমিয়া থেকে প্রাগৈতিহাসিক মিসরের অধিবাসীরা খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ বছর থেকে এ গাছের গুণাগুণ সম্পর্কে অবগত ছিল। প্রাচীন মিশরীয়রা এর ফল থেকে মদজাতীয় পানীয় প্রস্তুত করে ফসলের সময় তা পান করত। খ্রিস্ট-পূর্ব ৬০০০ বছর আগেকার সময়ে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে দেখা যায় যে, পূর্বাঞ্চলীয় আরবেও এর চাষাবাদ হতো।

প্রস্তর যুগে পশ্চিম পাকিস্তানের মেরগড় এলাকাতেও খেজুরের চাষাবাদ সম্পর্কে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে লিপিবদ্ধ আছে। দক্ষিণ এশিয়ার সভ্যতা হিসেবে বিবেচিত হরপ্পা এলাকার কথা উল্লেখ আছে খ্রিস্ট-পূর্ব ২৬০০ থেকে খ্রিস্ট-পূর্ব ১৯০০ বছর পর্যন্ত। প্রতি ১০০ গ্রাম পরিষ্কার ও তাজা খেজুর ফলে ভিটামিন সি রয়েছে যা থেকে ২৩০ ক্যালরি (৯৬০ জুল) শক্তি উৎপাদন করে। খেজুরে স্বল্প পরিমাণে পানি থাকে যা শুকানো অবস্থায় তেমন প্রভাব ফেলে না।

২০ ক্যালরির খেজুরের খাদ্যমান অবাক করার মতো। এতে চর্বি ০, সোডিয়াম ০.১৪ মি.গ্রা, কার্বোহাইড্রেট ৫.৩ গ্রাম, আঁশ ০.৬ গ্রাম, চিনি ৪ গ্রাম এবং প্রোটিন ০.২ গ্রাম। তুরস্ক, ইরাক এবং উত্তর আফ্রিকার পশ্চিমাঞ্চল মরক্কোয় খেজুরের উপযোগিতা প্রাচীনকাল থেকেই রয়েছে। মেদজুল এবং দেগলেত নূর জাতীয় খেজুরের চাষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া, অ্যারিজোনা এবং দক্ষিণ ফ্লোরিডায় আবাদ করা হয়ে থাকে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here