কেন হারিয়ে যাচ্ছে শিশুদের বইকেন্দ্রিক শৈশব?

বর্তমান তরুণ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা ছেলেবেলায় ঠাকুরমার ঝুলি, চাচা চৌধুরী, হি-ম্যান, বিল্লু কিংবা আরব্য রজনী পড়েনি এমন সংখ্যা প্রায় কমই পাওয়া যাবে। বয়সের কাটা একটু সামনে এগোবার পর এক এক করে হাতে আসে তিন গোয়েন্দা, মাসুদ রানা। গোয়েন্দা গল্প, সায়ন্স ফিকশন, থ্রিলার, হরর বা রহস্যের প্রভাব একটু একটু করে কমতে থাকলে পরিচয় হয় সাহিত্যের বিস্তর জগতের সাথে।

পরিচিত হবার সুযোগ হয় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রমুখ লেখকের সঙ্গে।তাদের প্রতিটি বইয়ের পাতায় যেন হারিয়ে যাওয়া যায় ইচ্ছে মতো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য অঙ্গন কিছুটা কঠিন মনে হলেও যেন বইয়ের সংখ্যা কমে না। বাংলা সাহিত্যের প্রতিভাসিত লেখকদের বইয়ের সীমায় হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে গেলে অনুবাদ গ্রন্থ বা ভ্রমণকাহিনি যেন আবার সতেজ করতে সক্ষম। সৈয়দ মুজতবা আলী, হুমায়ুন আহমেদ, হুমায়ুন আজাদ, বেগম রোকেয়া সাখওয়াত হোসেন, সুফিয়া কামাল, তসলিমা নাসরিন, আহমেদ সফা প্রভৃতি লেখক তো কৈশোর আর তারুণ্যের মাঝামাঝি সময়কালের এক বড় অংশ হয়ে থাকে। এক ঝটকায় প্রেমের উপন্যাস থেকে শুরু করে প্রবন্ধ সাহিত্য, সবটুকুতেই তারা ভ্রমণ করিয়ে আনতে সক্ষম।

আনিসুল হক, জাফর ইকবাল, ইমদাদুল হক মিলন বা হালের কিঙ্কর আহসান, সাদাত হোসাইন, মৌরি মরিয়মসহ এমন আরো অনেক লেখক যাদের কলম ও কাগজের সন্ধি এখনও চলছে, তারাও যেন থেমে নেই। নিত্যনতুন বইয়ের পাতা উপহার দিতে কাজ করে যাচ্ছেন তারা। বস্তুত বাংলা সাহিত্য এতটাই সমৃদ্ধ যে চোখের পাতায় ক্লান্তি চলে আসলেও বইয়ের সংখ্যা কমবে না। প্রকৃত বইপ্রেমী বা সদ্য বইয়ের সাথে সখ্যতা করতে চাওয়া শিশুটিরও জন্যও যেন পাঠক হিসেবে এক নিশ্চিন্ত পাঠ্য ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। তবুও বর্তমান শিশুদের মাঝে বইয়ের প্রতি এত উদাসীনতা কেন সে কথা যেন আজ সত্যি ভাববার বিষয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। তারা মূলত যা দেখবে, তাই শিখবে। কোন শিশু যদি নিজের পরিবারে সুস্থ ও সুন্দর পাঠ্য পরিবেশ না পায়, তবে তার মাঝে বইয়ের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও কম। বর্তমানে শিশুরা বড়দের মাঝে দেখছে আধুনিকতার নিদর্শন হিসেবে এক যান্ত্রিক কাঠামো।যেখানে স্মার্টফোন, টিভি, ভিডিও গেমসের প্রাধান্যই যেন বেশি। এতে করে একদিনে যেমন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে দেখা দেবে শারিরীক অসুস্থতা, তেমনি মানসিক অস্থিরতা। শিশুর সামাজিকীকরণের প্রথম পরিবেশ অর্থাৎ তার পরিবারই যেন হয়ে ওঠে তার সুন্দর ভবিষ্যতের প্রথম ধাপ।শিশুরা যেন আবার ফিরে পেতে পারে বইকেন্দ্রিক এক সুন্দর ভবিষ্যৎ। প্রমথ চৌধুরির “বই পড়া” প্রবন্ধটি যেমন তাদের গেলানো হচ্ছে, তেমনি করে পাঠ্যবই বা সাহিত্য শাখায় যেন আড়ষ্টতা না তৈরি হয় শিশুদের। শিশু দিবস কিংবা জন্মদিন থেকেই যেন তারা উপহার হিসেবে বই পেতে পারে, সে নিশ্চয়তাই দিতে হবার সবার। যাতে করে আমরা আবার ফিরে পেতে পারি জ্ঞান সমৃদ্ধ এক জাতি।

লেখক: ফামিন জাহান ঐশী, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। স্টুডেন্ট জার্নাল-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here