করোনা: জুমা ও জামাত নিয়ে মুসলিম দেশগুলি কী ভাবছে?

মারাত্মক ছোঁয়াচে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে সৌদি আরব-সহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই মসজিদে নামাজ পড়া বাতিল করা হয়েছে। জনগণকে এই সংকটকালে বাসায় নামাজ আদায় করতে বলা হয়েছে। জনগণকে ঘরে নামাজ পড়তে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকারও। তবে বাংলাদেশ মুসল্লিরা সরকারের নির্দেশ উপেক্ষা করে মসজিদে ভিড় জমাচ্ছে। শুক্রবার বায়তুল মোকাররমসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মুসল্লিদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে।

জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশেই মসজিদে নামাজ আদায় বন্ধ হয়ে গেছে। ধ্বংসাত্মক মহামারির সংক্রমণ এড়াতে ধর্মীয় নেতারা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলি অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য মসজিদে নামাজ আদায় না করতে জনগণের প্রতি আহবান জানিয়েছে।

ইরাকে শীর্ষস্থানীয় শিয়া আলেম গ্র্যান্ড মুফতি আয়াতুল্লাহ আলী আল-সিস্তানি জনগণকে স্বাস্থ্য নির্দেশনা মেনে চলার আহবান জানিয়ে বলেছেন, বর্তমান সময়ে এটি একটি ধর্মীয় দায়িত্ব। তুরস্কের ধর্মীয় বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রেসিডেন্ট আলি ইরবাস নবী মুহাম্মদের (সা.) শিক্ষাকে মহামারী মোকাবেলায় রাষ্ট্রীয় পরামর্শ অনুসরণের ভিত্তি হিসাবে উল্লেখ করেছেন।

কুয়েতে, মুসল্লিদের বাড়িতে থেকে নামাজ আদায় করার আহ্বান জানানো হয়েছে। মুসলমানদের মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায়ের ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির এই বিরল পরিবর্তন শুধু মহামারির কারণেই করা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে সরকার ও ধর্মীয় কর্তৃপক্ষগুলি এই প্রাদুর্ভাব রোধ করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে তাদের সবার বার্তাটি প্রায় এক রকম ছিল ‘বাড়িতে থাকুন, যোগাযোগ এড়ান এবং নিয়মিত আপনার হাত ধোয়া অব্যাহত রাখুন।

ক্যালিফোর্নিয়ার লুথেরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মের সহকারী অধ্যাপক রোজ আসলান বলেছেন, ‘মুসলমানরা অন্য কারও চেয়ে আলাদা নয়,বিশ্বের বেশিরভাগ মুসলমান বাস্তবমূখী এবং তারা অন্য সবার মতো ঘরে বসে আছেন।’

পরিচ্ছন্নতা ইসলামি শিক্ষার একটি অঙ্গ

মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য মুসলিম অঞ্চলগুলিতে মহামারি করোনা থেকে জনগণনের সুরক্ষায় জনস্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শের সাথে ধর্মীয় নির্দেশনা মেনে চলতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করছে কর্তৃপক্ষ। উদাহরণস্বরূপ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ধর্মীয় বিষয়গুলির দায়িত্বে থাকা কাউন্সিল একটি ফতোয়া জারি করেছে, সেখানে বলা হয়েছে- ‘জনস্বাস্থ্যের নির্দেশকে মেনে চলা ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের সমতুল্য’।

ফতোয়াতে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলি প্রদত্ত সকল জনস্বাস্থ্য নির্দেশনা ও বিধিবিধান কঠোরভাবে মেনে চলার পাশাপাশি অসুস্থতার সংক্রমণ ও বিস্তার রোধে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা সমাজের সকল অংশের ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা। এর মধ্যে রয়েছে ঘন ঘন সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়া, কারণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইসলামের শিক্ষার একটি অঙ্গ।’

অতীত থেকে শিক্ষা

যদিও ধর্মীয় নেতারা মহামারি দ্বারা সৃষ্ট জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তবে অনেক মুসলমানদের কাছে প্রাদুর্ভাবের মোকাবিলার ধর্মীয় কেন্দ্র মসজিদগুলি বন্ধ হওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। অনেক এলাকায় মসজিদ বন্ধ করা রীতিমতো চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে ইসলামে এর নজির রয়েছে বলে জানিয়েছেন সুন্নি মুসলিম আলেমরা। তাঁরা বলছেন, ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে মুসলিম সমাজে এমন মহামারির সময় মসজিদে নামাজ বন্ধের দৃষ্টান্ত রয়েছে। এটাকে ন্যায়সঙ্গত এবং ইতিবাচকভাবে দেখার জন্য দৃষ্টিভঙ্গির বদলের প্রস্তাব দিয়েছেন সুন্নি আলেমরা।

আসলান বলেছিলেন,’যেহেতু আমরা খুব সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে আছি, আমাদের এখন দেখতে হবে এমন সংকটকালে পূর্ববর্তী মুসলিম পন্ডিতদের ভুমিকা কী ছিল। অতীতে প্লেগ মহামারির সময় মুসলমানরা কী করেছিল সেটা আমাদের দেখতে হবে। এখন মুসলিম পন্ডিতরা মসজিদে নামাজ আদায় বন্ধের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটাকে মান্য করা আমাদের ধর্মীয় দায়িত্ব।’

আরব দেশগুলো নবী মুহাম্মদের (সা.) সময়কার নিয়ম হিসেবে আজানের বাক্যেও এনেছে পরিবর্তন। তবে আজানের সাথে মুসলিম জাতির দীর্ঘদিনের আবেগও জড়িয়ে আছে। আলেমরা বলছেন, আমাদের আবেগ সেটা মানতে কষ্ট হলেও ইসলামের বিধান হলো জীবনের জন্য, আবেগের চাহিদা পূরণের জন্য নয়। ভিন্নমত পোষণকারী আলেমদের অভিমত হলো, আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।

লন্ডনের আলহুদা একাডেমি এন্ড ইসলামিক সেন্টারের খতীব ও চেয়ারম্যান বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত আলেম মাওলানা আব্দুল কাদির সালেহ। তিনি জানান, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে বা এহেন দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় মসজিদে নামাজ পড়ার বিষয়ে ইসলামের স্পষ্ট বিধান রয়েছে । এমতাবস্থায় হাদীস বলছে : ‘তুমি নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না এবং কাউকে ক্ষতিগ্রস্থ করবেও না’— এটিই এক্ষেত্রে এই মূলনীতি হিসেবে প্রযোজ্য হবে বলে বিশ্বের অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম মতপ্রকাশ করেছেন।

জরুরি অবস্থায় রাসুলের (সা.) জামানায় এবং সাহাবীগণের সময়ে ঘরে নামাজ আদায়ের কথা বলা হয়েছে। আজানেও ‘হাইয়া আলাসসালাহ’ এর পরিবর্তে ‘সাল্লু ফির রিহাল বা সাল্লু ফি বুয়ুতিকুম’ বলে আহবান করা হয়েছে । সুতরাং এই বিশেষ পরিস্থিতিতে মসজিদে জামাতে বা জুমআয় না এসে ঘরে নামাজ আদায় করাই উত্তম এবং শরীয়তসম্মত। এটাই উলামায়ে কেরামের অভিমত। যদিও কোন কোন আলেমের মতামত এর বিপরীতে আছে।

সূত্র-ডয়েচে ভেলে

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here