করোনার বৈশ্বিক প্রভাব

উন্নয়ন ও পরিবেশ যে সমমুখী নয় তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত করোনা ভাইরাসের প্রভাব। জীবাণু অস্ত্রের গবেষণা উন্নয়নের পরিচায়ক। কিন্তু সেটা একইসাথে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক। বিশ্বের প্রায় পঁচিশটি দেশে এই করোনা চিহ্নিত রোগী রয়েছে। জাপান, ফিলিপিন, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ আশপাশের দেশগুলোতে নিয়মিত মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। বিশ্বায়নের ফলে মানুষ যেমন মানুষের কাছাকাছি এসেছে তেমনি পরিবেশ বিপর্যয়সহ রোগ-জীবাণু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সহজে সংক্রমিত হচ্ছে। তাই লক্ষ করার বিষয় হলো করোনার উৎপত্তি সংক্রান্ত যেসব তথ্য গণমাধ্যমে উঠে আসছে তার প্রত্যেকটি পরিবেশের সাথে কোনো না কোনোভাবে জড়িত। কেননা ধারণা করা হচ্ছে একটি কাঁচাবাজারে বন্যপ্রাণী বিক্রয়ের পর থেকে বা একটি সিফুডের বাজার থেকে এ ভাইরাস ছড়িয়েছে। এখন কথা হল যেখান থেকেই ছড়াক না কেনো তা পরিবেশ ধ্বংসের অনিবার্য ফল। বন্যপ্রাণী ধ্বংস করা আর সামুদ্রিক পরিবেশ নষ্ট করা উভয়ই স্বাভাবিক ইকোসিস্টেমের জন্য হুমকি স্বরূপ।

অন্য এক মাধ্যমে এসেছে হুবেই প্রদেশের উহানকে চীনের দ্বিতীয় জীবাণু অস্ত্রের গবেষণাগার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। যেখান থেকে এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। এক গণমাধ্যমে ইসরাইলের সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ড্যানি শোহমের সূত্র উল্লেখ করে জানানো হয় যে, উহানের এই ইন্সটিটিউট অফ ভাইরোলজি চীনের প্যাথজেন লেভেল-৪ মানের একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবাণুপ্রযুক্তি গবেষণাগার। যেখানে জীবাণু সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং চীনের এ ধরনের অবহেলা বিশ্বব্যাপী যে বিধ্বংসী অবস্থা সৃষ্টি করেছে তার দায়ভার চীনকেই নিতে হবে। এ ধরনের অসতর্কতাকে জৈবসন্ত্রাস নামে আখ্যায়িত করেছেন বিশেষজ্ঞরা যার মাধ্যমে জীবাণু ছড়িয়ে মানুষ হত্যা করা হয়।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছে মার্কিন এক স্বাস্থ্য সাময়িকী জন হপকিন্স। উক্ত সাময়িকীতে গত বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর সংখ্যায় বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, চীনে এমন একটি ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে যা অর্থনীতিতে বড় ধরনের সেইক অনুভূত করাবে। পরিবেশের ক্ষতি সাধন থেকে শুরু করে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটাবে। বর্তমান পরিস্থিতি তাদের ভবিষ্যৎ বাণীকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে। এখন সন্দেহ দানা বেঁধেছে যে তারা এত নিশ্চিতভাবে আশঙ্কা কেনো করেছিল? কোনোভাবে এটা পূর্বপরিকল্পিত নয় তো? এ সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। চীনের এত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান যেখানে সকল কল-কারখানা, শিল্প প্রতিষ্ঠান, খনিজ সম্পদসহ অর্থনৈতিক বিপুল অংশের সমাহার সেই স্থান আক্রান্ত হওয়া মানে তো পুরোই চীনই আক্রান্ত হওয়া তবে বাংলাদেশ এ ধরনের জৈব সন্ত্রাসের বিরোধিতা করে ২০১৬ সালে “বায়োসেফটি, বায়োসিকিউরিটি, বায়োটেরোরিজম, বায়োডিফেন্স” শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছিল।

কার্বন নিঃসরণ করে পৃথিবীকে উত্তপ্ত করার প্রধান ভূমিকা চীনের। সাথে যুক্ত হলো জীবাণু সংক্রমণ। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় দাবানলে বণ্যপ্রাণি পুড়ে যাওয়ার ঘটনা সর্বোতভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশকে করে তুলেছে মানবতাবিরোধী। বিশেষজ্ঞগণ নিশ্চিত করেছেন যে, ২০০৩ সালের সার্স ভাইরাসের চেয়েও ক্ষতিকর করোনা ভাইরাস। আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এমনকি বিদেশেও ছড়িয়ে গেছে। কিন্তু এখনো আবিষ্কৃত হচ্ছে না এর প্রতিষেধক। তবে বাংলাদেশের একজন হাকিম সম্প্রতি করোনার প্রতিষেধক হিসেবে নিম তেলের ব্যবহারের কথা বলেছেন। তবে এটা কতটুকু কার্যকর তা নিশ্চিত করে বলা যায় না । তবে ইতোমধ্যেই করোনা নিয়ে গবেষণা শুরু হয়ে গেছে আবার বলা হচ্ছে এটা যদি মহামারি আকার ধারণ করে তাহলে এর সিকোয়েন্স নতুন গবেষণার বিষয় হয়ে উঠবে।

সিঙ্গাপুর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজিস্ট লিন্ফা ওয়াং বিজ্ঞান সাময়িকী “নেচার” কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন এটি সাধারণত জিনেটিক ভাইরাস যা প্রাণী দেহ থেকে মানবদেহে সহজে চলে আসতে পারে । সচরাচর শীতের মাংসগুলোতে এ ভাইরাস সংক্রমণশীল হয়ে ওঠে। অর্থাৎ এটি ঠাণ্ডাজনিত রোগগুলোর একটি। যার প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে জ্বর, ঠাণ্ডা, শুকনো কাশির কথা বলা হয়। আবার নিউমোনিয়া সদৃশ একটি রোগ হিসেবেও দেখা হয়। চীনের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রও করোনা তো নিউমোনিয়া হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে রোগের নাম যাই হোক না কেনো এর প্রতিরোধের প্রস্তুতি কি তা-ই চিন্তার বিষয়।

ধারণা করা হচ্ছে মৃত বা আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ করছে না চীন। কয়েকটি গণমাধ্যম বিষয়টি সম্পর্কে বলেছে চীন প্রায় দশ হাজার লাশ গোপনে পুড়িয়ে ফেলেছে। এছাড়াও রোগাক্রান্ত মানুষের সংখ্যা নির্ধারণেও বিভিন্ন সময়ে ব্যাপক পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। আসলে দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো যে, এ ধরনের জীবাণু সংক্রমণ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর যা স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাপকভাবে ব্যাহত করছে। গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে দেশের মানুষকে। সমগ্র বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন চীনের নতুন বছরে ছুটি দফায় দফায় বৃদ্ধি করে জনগণকে গৃহবন্দী করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারা রাস্তাঘাট পাহারা দেয়া হচ্ছে যাতে মানুষ ঘরের বাইরে না যায় এছাড়া আর কোনো প্রতিষেধক নেই। তবে চীনের এ অবস্থা থেকে উত্তরণ বিশ্বব্যাপী কাম্য।

পরিবেশগত বিপর্যয়ের পাশাপাশি করোনা অর্থনীতিসহ সকল ক্ষেত্রে ব্যাপক বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। যাতায়াত যোগাযোগের ওপর এর প্রভাব দৃষ্টিগোচর হয়েছে। বাংলাদেশের সাথে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ওপরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পণ্য আমদানি-রফতানি বন্ধ হয়ে গেছে। তাছাড়া নতুন এলসি ও পূর্বে এলসি করা পণ্যগুলো জাহাজীকরণ করা বন্ধ হয়ে গেছে অথচ চায়না-বাংলাদেশ বৈদেশিক বাণিজ্য প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই যুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেশ খানিকটা ফাটল দেখা দিয়েছে বিশেষ করে আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পে। কেননা এর কাঁচামালের সিংহভাগই আসে চীন থেকে। এছাড়া অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও আমরা চীনের উপর নির্ভরশীল হলেও তা সামলে নিয়ে যাবে বলে বাণিজ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন।

অপরদিকে চীনের সাথে বাংলাদেশের ১২টি প্রকল্পে নব্বই হাজার কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। যার সঙ্গে যুক্ত আছে দুই হাজারের বেশি চীনা বিশেষজ্ঞ। এর মধ্যে রোড ট্রান্সপোর্ট এন্ড হাইওয়ে ষোল কোটি ডলার, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে পনের কোটি ডলার, কর্ণফুলী টানেলে সত্তর কোটি ডলার, আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ত্রিশ কোটি ডলার, পাওয়ার গ্রিড একশত বত্রিশ কোটি ডলার যার প্রতিটিই হুমকির সম্মুখীন বলে আশঙ্কা করেছেন বিশ্লেষকরা। একইসাথে ভারতের অর্থনীতিকেও ছুঁয়ে গেছে করোনা। “বিক্রিতে ধাক্কা, নতুন আতঙ্ক করোনা” শীর্ষক এক রিপোর্টে আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছে ভাইরাস আতঙ্কে চীনের কারখানাগুলো বন্ধ থাকায় কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হচ্ছে যার প্রভাব পড়েছে বিক্রিতেও। গাড়ি বিক্রি সংস্থাগুলোর সংগঠন ‘সিয়াম’ জানিয়েছে বিক্রি কমেছে ৬.২ ভাগ। তবে এ প্রভাব কতটা বিস্তার লাভ করবে তা সঠিকভাবে বলতে পারেনি সিয়াম এর ডিরেক্টর জেনারেল। এছাড়াও প্রভাব পড়েছে বন্দরগুলোতে। চীনে সম্প্রতি ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারিং কিছু পণ্যের রফতানি বৃদ্ধি পেয়েছে ফলে রফতানি পণ্য বন্দরে আটকা পড়েছে। নিষেধাজ্ঞা থাকায় পণ্য আনা-নেয়া হচ্ছে না ফলে দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থানের বিপরীতে জরিমানা গুণতে হতে পারে। যেটা মালিকপক্ষের জন্য আর্থিক ক্ষতির কারণ। পাশাপাশি ক্ষতির মুখে পড়েছে চামড়া শিল্প। কারণ ভারতে বেশকিছু পণ্যের জোগান দিয়ে থাকে চীনের ক্ষুদ্র ও মাঝারি বহু কারখানা যেগুলো ভাইরাস আতঙ্কে বন্ধ।

খোদ চায়নার বিপাকও কম নয়। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ এমন বিপদে নিশ্চিতভাবে বৈশ্বিক নিরাপত্তাও হুমকির সম্মুখীন। আশঙ্কা করা হচ্ছে চলতি বছরের প্রথমে চীনের প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশ কমে যাবে। কেননা সমুদ্রতীরবর্তী প্রান্তিক এলাকাগুলোর পরই মধ্য চীনের হুবেই প্রদেশ প্রধান অর্থনৈতিক অঞ্চল যা জিডিপিতে ৪% অবদান রাখে। একইসাথে এটি একটি ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে পরিচিত। এখানে গড়ে উঠেছে অটোমোবাইল নিসান, হোন্ডা ও জেনারেল মোটরসের কারখানা। যেগুলো বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নতুন বছরের শুরুর এই সময়টাতে সারা বছরের তুলনায় ৯ শতাংশ বেশি আয় করে এই খাত থেকে। গতবছর এসময় চীনের আভ্যন্তরীণ আয় ছিল প্রায় এক ট্রিলিয়ন ইউয়ান। এবছর তার পুরোটাতেই ধস নেমেছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে নতুন বছরের শেষে কল-কারখানাগুলো চালু হলে ধস উত্তরণ সম্ভব হবে। কিন্তু কতটুকু অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে সেটা দেখার বিষয়। পাশাপাশি চীন ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা সৃষ্টি করেছে অনেক দেশ। ফলে ফ্লাইট বাতিলসহ যাত্রী সঙ্কটে পড়েছে চীন ও অন্যান্য এয়ারলাইন্স কোম্পানিগুলো। এমনকি অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সঙ্কটও দেখা দিয়েছে চীনে। কেননা উহান হল চীনের অন্যতম তেল গ্যাস সরবরাহ কেন্দ্র।

জাপানসহ প্রতিবেশী প্রত্যেকটি দেশের সাথে জল স্থল বা আকাশপথে নিষেধাজ্ঞার রোষাণলে পড়েছে চীন। বন্দরগুলোতে জাহাজ বা পণ্যের অবরুদ্ধি ক্রমাগত বাড়ছে। তাছাড়া জাপানি পর্যটনশিল্প আশিভাগ চীনের ওপর নির্ভরশীল যা ভাইরাসের বিস্তারে সঙ্কটের মুখে পড়েছে। একইসাথে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিক ভিত্তি। অপরদিকে আমেরিকা অর্থনৈতিক বৈরিতার পাশাপাশি পরিবেশগত সর্তকতাও অবলম্বন করছে। চীনে অবস্থানরত কূটনীতিকসহ সাধারণ নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে নিয়েছে। এমনকি চাইনিজ নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের পর্যটনশিল্প। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০০৩ সালে চীনে সার্স ভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল চার হাজার কোটি ডলার আর করোনায় বছরের শুরুতেই চীনের ক্ষতি ছয় হাজার কোটি ডলারের বেশি। সুতরাং এই ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা সামাল দেয়া চীনের অর্থনীতির ওপর বিশাল এক চাপ হয়ে দাঁড়াবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here