“এ যাত্রায় যদি বেঁচে যাই”

করোনাভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, মোবাইলে কিংবা কিঞ্চিত সাক্ষাতকারে কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা, অনুতপ্ত বা মাফ চাওয়ার প্রবনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। করোনা থেকে বাঁচার জন্য নানা ধরনের টোটকা যেমন ন্যাড়া হওয়া, আদাররস, লেবু, রসুন, মধু, কালোজিরা, লং পানির সাথে মিশিয়ে খাওয়া, ভাপ নেওয়া, গোমূত্রতেও নাকি খুঁজে পাওয়া গেছে এ রোগ থেকে বাঁচার ত্বরিত সমাধান, যা পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে এখন নাকি দুধের চেয়েও চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। ধর্মের পুরোহিতদের কাছে গিয়ে রোগমুক্তির জন্য নেওয়া হচ্ছে কার্যকরী টিপস। মিট, ক্যামব্রিজ, অক্সফোর্ড সহ পৃথিবীর সব বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা গভীর জ্ঞানে মগ্ন গবেষনার ল্যাবে। ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, মাঠপ্রশাসন প্রত্যেকেই নিজ জীবন কে তুচ্ছ করে মানবিক যুদ্ধের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

অতি আত্মবিশ্বাসী মানুষ সম্ভিত ফিরে পেয়ে শপথ করে বলছে কথা দিচ্ছি এ যাত্রায় যদি বেঁচে যাই তাহলে আর ফিরবো না অতীত এবং নিকট পাপ বা অপরাধে! তবে কি আমরা করোনা থেকে হিরন্ময়ের জীয়ন কাঠি পেয়ে যাব যাকে স্পর্শ করলেই সব বাঙ্গালি আমরা হয়ে উঠব একেকজন কৃষ্ণ সারথি। পাপাত্মা রুপান্তরিত হবে পূর্ণাত্মায়। তবে কি বোন বঞ্চিত হবে না ভাই কর্তৃক, এক ভাইয়ের সরলতার সুযোগ নিয়ে আরেক ভাই হবে না লুন্ঠনকারী, আমানতদার হবে না খিয়ানতকারী, ধর্মপ্রচারক হবে না ধর্ম ব্যবসায়ী, রক্ষক হবে না ভক্ষক, সত্যের সাথে মিথ্যা বা মিথ্যার সাথে সত্যকে গোয়েবলসীয় (মিথ্যা প্রপাগান্ডা) কায়দায় মিশানো হবে না তথ্য সন্ত্রাসের ক্ষতিকারক ভ্যাক্সিন। নাড়ীর সমপর্ককে ঠুনকো করে সভ্যতার সবচেয়ে বড় প্রহসন বৃদ্ধাশ্রম তৈরি করা হবে না? অন্যের সম্পদ জোরপূর্বক দখল, অপহরণ, তহবিল তছরুফ, জালিয়াতি, অগ্নি সন্ত্রাস, বোমা হামলা, শিল্প সংস্কৃতির প্রতীক বিনষ্টকরণ, জাতিগত, ধর্ম, সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করে তামিলীয় ফিল্মী স্টাইলে রক্ত গঙ্গা বইবে না? ক্ষমতার অপব্যবহার, মিথ্যা অপবাদ, পরচর্চা, নিন্দা, হিংসা, দ্বেষ, তোষামুদের তৈলাক্ত অস্ত্রের কৌশলী ব্যবহারে দক্ষ, যোগ্যরা বঞ্চিত হবে না? কটু কথা, কটু বাক্য দ্বারা কাউকে কষ্ট না দেওয়ার পাটা দলিল কি হবে? সামান্য বিষয় অর্থাৎ তিলকে তাল করা, চুরি কে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, দস্যুপনা, রাহাজানি, সাইবার ক্রাইম বা হ্যাকিং, ক্র্যাকিং, পাইরেসি, পর্নোগ্রাফি নামক শব্দগুলো কি ঠাই পাবে অব্যবহৃত পরিত্যক্ত ডিকশনারীতে? কিন্তু সত্যিই সেলুকাস! আমরা দেখছি সর্টকাট পন্থায় বড় হবার ফাঁকফোকর খুজে হঠাৎ আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ, দানবীর, সমাজসেবক, উন্নয়নের রুপকার কিংবা সৎ মেহনতি মানুষের কন্ঠস্বরের লাইন দীর্ঘ। সমাজের সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত, ভদ্র,স্মার্ট, পোশাকে আশাকে কথাবার্তায়, আচার-আচরণে আধুনিক, কেতাবি জ্ঞানে ঋদ্ধ কিন্ত খোয়াজ খিজির (আঃ) এর চশমায় বা বাস্তব ওয়েবক্যাম এর লেজারে প্রমাণিত বড় দূর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, সুদখোর, কমিশনভোগী সমাজবিরোধী, দেশবিরোধী। দেশের টাকা বিদেশে পাচার, মানব পাচার, সেকেন্ডহোম বানানো, সরকারি বরাদ্দে নয়ছয়, ওজনে কম দেওয়া, ফ্রেশ খাদ্যে ভেজাল মিশিয়ে মানুষ হত্যার ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া যেন মেডিসিন অফ সার্জারির নতুন শাখা।

ঠিকাদারী, টেন্ডারী, নির্মাণ সামগ্রীতেও অস্বচ্ছতা এবং নিম্নমানের কাঁচামালের ব্যবহার মোটাদাগে বলতে গেলে ওপেন সিক্রেট কম বেতন বা বেশি বেতন পাওয়ার সাথে লাইফস্টাইলে সীমাহীন জৌলুসের ভারিক্কি আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকলেও প্রশ্ন তোলা মানা। পিতামাতার প্রিয় কন্যাকে পাত্রস্থ করবার জন্য যখন পাত্রের সৎ উপার্জনের চাইতে উপরি আয়কে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয় বিবেচনা করা হয় না সততা, নৈতিকতার। পতিতাবৃত্তি, পরকীয়া, ধর্ষন, ইভটিজিং, ধর্মীয় ফতোয়ার অপব্যাখ্যা, সবলা, অবলা ভেবে এখনও নারীকে শারীরিক, মানসিক নির্যাতনের স্টীমরোলার চাপিয়ে পুরুষেরা কর্তৃত্ববাদ কে প্রকাশ করতেই যেখানে বেশি উৎফুল্ল বোধ করে, করোনা কি পারবে অদম্য পুরুষকে রুখতে? আবার সবলা-অবলা নারীজাতি আইনের সুযোগ ব্যবহার করে পুরুষ নির্যাতনের খেতাব পেয়েছেন সেটির ও কি ইতি ঘটবে? ডিনামাইট যা পারে না মাদক পারে অবলীলায়। যুবসমাজ,পরিবার ধংস করার জন্য মাদকের চাইতে শক্তিশালী ব্রক্ষ্মাস্ত্র দ্বিতীয়টি আর নাই। করোনা পূর্ববতী সময়ে যারা মাদক গ্রহন, লেনদেন ও বানিজ্যের সাথে জড়িত হয়ে সামাজিক অপরাধ এবং ব্যক্তি অপরাধকে উৎসাহিত করেছেন এই দূর্দিনে তারাও কি ভাবছেন এবার থামতে হবে?

ব্যবসায়ী তার ব্যবসার সূত্র ভাল বুঝেন। মজুদ করা, সময় বুঝে দাম বাড়ানো, কালোবাজারি, সিন্ডিকেট, কারসাজি সহ নানা অভিনব অন্যায় রাস্তা ব্যবহার করে মানুষকে জিম্মি করে ব্যবসা ব্যবস্থাপনা বা ডন উপাধি পান। ৪০ টাকার পেয়াজ ২০০-৩০০ টাকা, ২০ টাকার মাস্ক ১৮০-২০০ টাকা, নিম্নমানের পণ্যে উন্নত ব্রান্ডের লগো লাগিয়ে চড়া দামে বিক্রি করা আরও কত কি! অথচ এটা যে পাপ অসহায় দিন মজুর সাধারণ মানুষ যারা দিনে আনে দিনে খায় যাদের রক্ত, ঘাম আর শ্রমে সভ্যতার পিলার গুলো পেয়েছে শক্ত ভিত তাদের কথা দিব্যি ভুলে গিয়ে লোভাতুর লকলকে জিভ আর অশুভ চোখের চাহনি মনে করিয়ে দেয় এই অধর্মের কারণেই অতীতে অনেক জাতি ধংস হয়েছিল। পরিবহন সেক্টরের নৈরাজ্যও একই সূত্রে গাথা। আইনের পতি সম্মান প্রদর্শন করা নাগরিকের দায়িত্ব; তেমনি আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও প্রাপ্তি নাগরিক হিসেবে অধিকার। কিন্ত এর ব্যবহার ও প্রয়োগ বিধি নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন ও সংশয়। পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বিচার ব্যবস্থা যদি উচু-নিচু ভেদে হয়! যিনি যে আসনে বসে আছেন বিচারকের ভূমিকায় তিনি যদি ন্যায় বিচারক না হয়ে পক্ষপাতদুষ্ট হন তবে সেটি অবধারিত পাপ। পাশের প্রতিবেশি অভুক্ত, কন্যা দায়গ্রস্থ পিতা যৌতুকের টাকা ম্যানেজ করতে পারছেন না বিধায় বিয়ের বিষয়টি উপেক্ষিত, বাসার কাজের লোক চাতক চোখে দেখছে আমি আপনি বৈষম্য করছি, অন্যের সন্তানের অপরাধ মূখ্য হলেও নিজের বেলায় অন্ধ বিচার!

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here