একুশ আমাদের সোনালী সংগ্রামের রাজকাহিনী

১৯৪৭ সালে যখন দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হয়েছিল তার আগেই আসলে শুরু হয়েছিল ভাষা নিয়ে বিতর্ক। প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দুরত্বে অবস্থিত দুটি ভূখন্ডের দুটি ভিন্ন ভাষার জাতিসত্তাকে মিলিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে সূচনা হয়েছিল আন্দোলনের।

আমি আমার মায়ের ভাষায় কথা বলবো এটা আমার মৌলিক অধিকার। জোর করে কেউ তাদের ভাষা আমাদের উপর চাপিয়ে দিবে তা কখনো বরদাস্ত করবো না। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে আছে আমাদের সোনালী সংগ্রামের রাজকাহিনী। আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যে জন্ম বাঙালি জাতির।

বাঙালির ইতিহাসে ভাষা আন্দোলনের প্রভাব ব্যাপক। মূলত এই আন্দোলন ছিল পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন। বাঙালির মৌলিক অধিকার রক্ষায় বাংলা ভাষাকে ঘিরে গণদাবিরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে। পরে ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই সব আন্দোলন-সংগ্রামের ডালপালার বিস্তার হয়। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধও এটির ব্যতিক্রম নয়। ফলে ভাষা আন্দোলন বাঙালির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

১৯৪৮ সালে ঢাকায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণার প্রতিবাদে আন্দোলন সংগঠিত করার কারণে ১১ মার্চ বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ১৫ মার্চ মুক্তি লাভ পাওয়ার পরদিনই ভাষার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগ্রাম পরিষদের সভায় সভাপতিত্ব করেন বঙ্গবন্ধু।

১৯৪৯ সালে ডিসেম্বর মাসে তাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। একটানা ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তিনি কারাগারে ছিলেন। সেখান থেকেই তিনি ভাষা আন্দোলন সংগঠিত করার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এমনকি তিনি জেলখানায় অনশনও করেছেন।

আমাদের মুখের ভাষা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রথম গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তারে আরো দ্রুত ভাষা আন্দোলনের প্রভাব মানুষের অন্তরে দাগ কেটে যায়। বাঙালি জাতি তখন ঘর থেকে বের হয়ে রাজপথে নেমে আসে ভাষার জন্য।

বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাঙালিয়ানার জোয়ার ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির মধ্য দিয়েই এসেছে। একুশের চেতনার প্রসারিত প্রভাব থেকেই বাঙালির মুক্তির মন্ত্র বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা, ছাত্রদের ১১ দফা। এগুলোর সম্মিলিত ফলই হলো উনসত্তরের গণজাগরণ। এর পরিণামে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। তাই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে ভিত্তি করেই বাংলাদেশের উৎপত্তি। বাঙালি জাতীয়তাবাদের সবকিছুই শিখেছি ভাষা আন্দোলন থেকে। আমরা বাঙালি, বাংলা ভাষায় কথা বলি, আমাদের দেশ বাংলাদেশÑএসব বোধ এ আন্দোলন থেকেই পাওয়া। ভাষা আন্দোলন থেকেই উৎসারিত সব মন্ত্র।

ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা আন্দোলন-পরর্র্বতী সময়ে বাঙালিয়ানার যে জোয়ার আসে, সেটাই বাঙালি জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয়। আর এই জাতীয়তাবাদের উৎসারিত চেতনা থেকেই আমরা এখনো সব আন্দোলন-সংগ্রামে প্রেরণা পাই।

শোষণের বিরুদ্ধে, নির্যাতনের বিরুদ্ধে, দাবি আদায়ের সংগ্রামে আমাদের উজ্জীবিত করে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি। এসব প্রেরণাকে সঙ্গী করেই আমরা এগিয়ে যাই সামনের দিকে, আজ যতটা পথ বাংলাদেশ এগিয়েছে, এর পেছনে অনুপ্রেরণা আমাদের চির অম্লান ভাষা আন্দোলন। আমাদের একুশের চেতনার জন্ম হয়েছিল একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে।

তৎকালীন পাকিস্তানে শতকরা ৫৬ জনের মুখের ভাষা বাংলা হলেও শতকরা সাতজনের মুখের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। আর ১৯৪৮ সালে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে গর্জে ওঠে বাঙালি। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তাঁরা আন্দোলন শুরু করে।

১৯৪৯ থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে ক্রমে জোরাল হয়ে উঠে বাংলা ভাষার মর্যাদা আদায়ের দাবি। ১৯৫২ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ ও সাধারণ ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত হয়।

পাকিস্তান সরকার আন্দোলন দমন করার জন্য ১৪৪ ধারা জারির মাধ্যমে জনসমাগম, জনসভা ও মিছিল নিষিদ্ধ করে দেয়। ছাত্ররা সংগঠিতভাবে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করলে পুলিশ গুলি চালায়। শহিদ হন সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতসহ আরও অনেকে।

পরদিন সারারাত জেগে শহিদদের স্মরণে গড়া হয় শহিদ মিনার। পুলিশ তা ভেঙে ফেললে আবারও গড়ে ওঠে শহিদ মিনার। ভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তায় জন্ম নিয়েছিল একুশের চেতনা। এই চেতনা আমাদের জাতীয় জীবনে আত্মত্যাগের বীজমন্ত্র।

১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে এই দিনটিকে শহীদ দিবস হিসেবে পালন করা হতো। এই ইতিহাস বাংলাদেশের অনেকেরই জানা। কিন্তু এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরির পেছনে রয়েছে আরও অনেক সংগ্রামের ইতিহাস।

লেখক : মো. ফজলুল করিম মিরাজ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ।

এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। স্টুডেন্ট জার্নাল-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here