সতীর্থদের নির্মম প্রহারে বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদের প্রাণ হারানোর ঘটনায় আমরা শোকাহত। এই ঘটনার নিন্দা জানাই। এখন কথা হচ্ছে, আবরার হত্যা কী শুধুই একটি ক্যাম্পাসের বিচ্ছিন্ন ঘটনা? নাকি দেশ অস্থিতিশীল করতে একটি পক্ষের নির্দেশে ঘটানো হয়েছে? কয়েকটি কারণে এসব নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এক.
নিহতের কান্না এবং বাঁচার আকুতির পরও কয়েক ঘণ্টা ধরে বিরতি নিয়ে পিটিয়ে কাউকে হত্যা বিবেকবান কোনো মানুষ ঘটাতে বা সমর্থন করতে পারে না। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে ফেসবুকে দেওয়া একটি স্ট্যাটাসের জেরে ছাত্রলীগের ‘একদল বিপথগামী’ কর্মীর বিরুদ্ধে আবরার হত্যার অভিযোগ উঠেছে।

দুই.
গত ৬ অক্টোবর আবরার হত্যার পর বুয়েটসহ সারাদেশে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্তদের গ্রেফতার করে এবং সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে সরকার দ্রুত ব্যবস্থাও নিয়েছে। আবরারের হত্যাকারী এবং ইন্ধনদাতাদের পারিবারিক বা রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক না কেন, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বুধবার একটি সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণাও দিয়েছেন। এদিকে আন্দোলনকারীদের দাবির মুখে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে শনিবার প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সব দাবি মেনে নেয়ার পরও বুয়েটে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

তিন.
আবরার হত্যাকান্ড- নিছক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং গভীর ষড়যন্ত্র। কয়েক বছর আগে বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গে নাগরিক ঐক্যের মাহামুদুর রহমান মান্নার টেলিফোন আলাপ ফাঁস হয়েছিল। ওই টেলিফোন আলাপে মান্না আন্দোলন জমাতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে লাশ ফেলতে বলেছিলেন। এর আগে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে সহিংসতার ঘি ঢেলেছে বিরোধী দল বিএনপি। বিষয়টি গোয়েন্দারা প্রমাণও করেছেন। যেহেতু বিএনপি অতীতে এই কাজ করেছে, এটা সন্দেহ করা অমূলক নয় যে আবরার হত্যায় দলটির হাত থাকতে পারে।

বিএনপির চেয়ারপাসন খালেদা জিয়া জেলে, দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানও লন্ডনে স্বেচ্ছায় নির্বাসনে রয়েছেন। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি এরই মধ্যে বুঝে গেছে, নির্বাচনের মাধ্যমে তারা ক্ষমতায় আসতে পারবে না। তাই ক্ষমতায় থাকা ১৪ দলীয় জোটের নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগকে গদিচ্যুত করতে ষড়যন্ত্রের প্রতিটি সুযোগ ব্যবহার করে বিএনপি।

চার.
আবরার হত্যা নিয়ে কিছু প্রশ্নে উত্তর বের করা জরুরি। প্রথমত, আবরার হত্যাকারীদের গ্রেফতারের পরও সারা দেশে ছাত্রদের আন্দোলন ছড়িয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যান্য হত্যাকান্ডের ক্ষেত্রে ক্যাম্পাস দ্রুত শান্ত হয়, কিন্তু বুয়েটে আন্দোলন এখনো অব্যাহত রয়েছে। তৃতীয়ত, বিরতি নিয়ে তিন-তিনবার নির্দয়ভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে আবরারকে। কেন? জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যু করতে আবরারকে কি কেউ হত্যার নির্দেশ দিয়েছিল? চতুর্থত, পুলিশকে ফোন না করে বা দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে এত বড় একটি ঘটনাকে কেন এড়িয়ে গেলেন শেরেবাংলা হলের প্রভোস্ট? পঞ্চমত, রহস্যজনকভাবে বুয়েটের উপাচার্য রাতভর নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে কেন পরদিন জনসমক্ষে হাজির হলেন?

পাঁচ.
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন ‘মা’ হিসেবে আবরার হত্যাকান্ডের বিচার নিশ্চিতের ঘোষণার পরও কেন আন্দোলন ছড়িয়েছে সারাদেশে? এসব ঘটনার কারণে মনে হচ্ছে, আবরার হত্যার পেছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে এবং এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের আবেগকে ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ এ ধরনের হত্যাকান্ডের মাধ্যমে সারাদেশে সহিংসতা ছড়ানো খুব সহজ।

ছয়.
খবরে প্রকাশ, বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ রাজপথ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ছাত্রদলকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন লন্ডনে থাকা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিশেষ করে বুয়েটের আবরার ফাহাদ ইস্যু নিয়ে ক্যাম্পাস গরম রাখার ব্যাপারেও নির্দেশনা দেয়া হয়।
অন্যদিকে গত শনিবার সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেছেন, আন্দোলন আর বিক্ষোভের মাধ্যমে আগামী ২০ অক্টোবর আওয়ামী লীগ সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করা হবে। ওইদিন সরকারের পদত্যাগ ও জাতীয় সরকারের দাবিতে সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হবে।

সাত.
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নানারকম উসকানিমূলক পোস্ট দিচ্ছে ক্যাসিনো গডফাদারদের সমর্থকরা। অনেকেই বলছেন, কার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন এসব তথাকথিত সমর্থকরা? রাষ্ট্রের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ নেয়ার সাহস এরা পায় কোথায়?

জানা যায়, সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়েছে ক্যাসিনো হোতাদের একটি গ্রুপ। অবৈধভাবে গড়া নিজেদের সম্পদ এবং টাকা বাঁচাতেই এই কৌশল নিয়েছে ওই গ্রুপটি। বিএনপি-জামাতকে টাকা ইনভেস্ট করছে গ্রুপটি। এর পরেই দেখা যায়, হঠাৎ করেই ঢাকার রাজপথে বিএনপি এবং শিবিরের বিশাল মিছিল। যেখানে কয়েকদিন আগে ২০ জন মানুষও হতো না বিএনপি-জামাতের মিছিলে।

ক্যাসিনো বিতর্কের আরেক হোতা কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদও সিঙ্গাপুরে বসে সরকারবিরোধী নানারকম প্রপাগান্ডা ছড়াচ্ছেন। এই বিতর্কিত কাউন্সিলর ফকিরাপুলের হুন্ডি ব্যবসায়ী হারুনের মাধ্যমে বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভির কাছে টাকা পৌঁছে দিয়েছেন বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। ইতোমধ্যে জিকে শামীম বিএনপি মহাসচিব ফখরুলের চিকিৎসার টাকা দিয়েছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে। এছাড়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে মাসে ১ কোটি টাকা দিতেন বলে খবর বেড়িয়েছে।

চলমান শুদ্ধি অভিযানে যারা অভিযুক্ত, সন্দেহভাজন- তারা ভেবেছিল, প্রধানমন্ত্রী নমনীয় হতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করলেন, অভিযান চলবে। মূলত তখনি ষড়যন্ত্রকারীরা নতুন খেলা শুরু করেছে। এখন অভিযুক্তরা নিজেদের বাঁচাতে শেখ হাসিনা সরকারকে উৎখাত করতেও পিছপা হবে না। সরকারবিরোধীরা অভিযুক্তদের আশ্বস্থ করেছে, ক্ষমতার পালা বদল হলে অভিযুক্তদের সম্পদ ও টাকা নিরাপদ থাকবে। তাই বিপথগামী এই গ্রুপটি সরকার বিরোধীদের অর্থায়ন করছে। হেফাজতের মতো একটি জমায়েত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও গোয়েন্দা সূত্র নিশ্চি হয়েছে।

আট.
ছাত্রলীগের সাবেক দুই শীর্ষ নেতা এখন লন্ডনে অবস্থান করছেন। এদের একজন নিয়মিত হাওয়া ভবনের টাকা পেতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে ওই দুই নেতার যোগসূত্র পেয়েছে গোয়েন্দারা। ইতোমধ্যে বিএনপির এক পলাতক শীর্ষ নেতার সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদ্বয়। একসময় মন্টু-আওরঙ্গ গ্রুপ করা ঢাকা মহানগরের এক শীর্ষ নেতাও এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে রয়েছেন বলে ধারণা করছেন গোয়েন্দারা।

বুয়েটের ঘটনার পরে আটককৃতদের হাসিমুখ থাকাও অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। হত্যাকারীরা কী নিশ্চিত ছিল, তাঁদের কিছুই হবে না। সর্বোচ্চ মেধাবী ছেলেরা সিসি টিভির সামনেই এমন ঘটনা কেন ঘটালেন? কী বার্তা দিতে চাইলো হত্যাকারীরা? বুয়েট ছাত্র অমিত সাহাকে নিয়ে এতো সমালোচনা কেন? অমিত সাহা একটি বিতর্কিত সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে। এই ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন- একই সঙ্গে বিচারের দাবি তুলেছে। দেশে এমন ঘটনা নতুন নয়। তবে একসঙ্গে সবার দাবি- একটির সঙ্গে অন্যটি যুক্ত বলে মনে করা হচ্ছে। এসব বিষয় বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

 

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here